অর্থ-বাণিজ্য
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার
তারিখ: 15 - 10 - 2020


সুইস ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যাওয়া লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনায় কোনো সাফল্য নেই। এ নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক হচ্ছে, গ্রহণযোগ্য পথ বের হচ্ছে না। টাকা ফেরত আনা দুরূহ ও অত্যন্ত জটিল। এর পরও আশাবাদী সরকার। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

পাচারের অর্থ উদ্ধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে নির্ধারিত সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা হবে।



‘বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের উপায়’ সংক্রান্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক বৈঠকে এমন মতামত উঠে এসেছে। বৈঠকে উত্থাপিত এক কার্যপত্রে বলা হয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ১০টি দেশে অর্থপাচার হয়ে থাকে। এসব দেশের তালিকায় রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেইম্যান আইল্যান্ডস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিতকরণ ও টাকা ফেরত আনার

. বিষয়টি অনেক জটিল প্রক্রিয়া। প্রথমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পাচার করা অর্থ চিহ্নিত করে তদন্তের পর মামলা করতে হয়। এর পর আদালত দিলেই কেবল প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হলে তদন্তকারী সংস্থা ওই দেশে পাচারের অর্থ অবরুদ্ধ করার জন্য মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বা এমএলএর জন্য অনুরোধ করতে পারে। এর পর ওই দেশের আদালত থেকে পাচারের অর্থ অবরুদ্ধ করার অনুমতি নিয়ে কয়েকটি ধাপের পর দুই দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ওই দেশের আদালতের কাছে বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। বাংলাদেশের আদালতে যে রায় হয়েছে অন্য দেশের আদালতে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। প্রমাণ হলেও আবার কস্ট শেয়ারিং বা অর্থের ভাগাভাগির ব্যাপার রয়েছে। নানা শর্তও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে যে দেশে অর্থ পাচার হয়েছে তাদের সদিচ্ছার অভাব থাকলে অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেনসহ বহু দেশ এ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। তবে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা খুবই কঠিন। টাকা যে পাচার হয়েছে, তা প্রমাণ করতে হয়। যা সহজ কাজ নয়। প্রমাণিত হলেও যে দেশে পাচার হয় সে দেশের বিচারিক আদালতের মাধ্যমে ফেরত আনতে হয়। কিন্তু ওই দেশ ফেরত দিতে চায় না। তখন সিভিল কেস করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সফলতার হার খুবই কম। তিনি বলেন, যেসব সূত্রের মাধ্যমে টাকা পাচার হয় সেসব সূত্র বন্ধ করাই সর্বোত্তম।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে প্রধানত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে। তবে অর্থপাচার হয়ে গেলে তা ফেরত আনা কঠিন হওয়ার কারণে পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ’। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ১০১৮’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশি গ্রাহকের জমা করা অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৭ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৪৮১ দশমিক ৩২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। ২০১৮ সাল শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১৭ দশমিক ৭২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জমা করা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা সুইস ব্যাংকগুলোয় জমা থাকলেও এর মধ্যে কী পরিমাণ টাকা বাংলাদেশ থেকে সরাসরি সুইজারল্যান্ডে গেছে তা নিশ্চিত নয়। এর একটি অংশ বিদেশে বসবাস ও ব্যবসারত বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ব্যক্তিদের মাধ্যমে পাঠানো হতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’র (জিএফআই) ‘ট্রেড-রিলেটেড ইলিসিট ফাইন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ইন ১৩৫ ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৮-১০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩তম। প্রতিবেদন মতে, ট্রেড মিস-ইনভয়েসিংয়ের (আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং) মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ২০১৩ সালে ৯৬০ কোটি ডলার, ২০১৪ সালে ৬৩০ কোটি ডলার ও ২০১৫ সালে ৫৯০ কোটি ডলার অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে পাচার করা অর্থের তথ্য-উপাত্ত ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মতে, হাল-নাগাদ উপাত্ত না-পাওয়া গেলেও ট্রেড মিস-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ক্রমশ কমেছে।

সূত্রমতে, বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (বিএফআইইউ) কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সন্দেহ করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে ‘এগমন্ট সিকিউর ওয়েব’-এর মাধ্যমে বিদেশি ‘এফআইইউ’-এর কাছ থেকে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি ‘এফআইইউ’-এর মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ অনুরোধের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থা থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বলা হয়েছে, এ পরিপ্রেক্ষিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থের পরিমাণ শনাক্তকরণ ও তা ফেরত আনার বিষয়ে ‘বিএফআইইউ’সহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা- ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’, সিআইডি (বাংলাদেশ পুলিশ), সিআইআইডি ও সিআইসি (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অনুরোধ পাঠানোর জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

স্বাধীন বাংলা ডট কম
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২, ফায়েনাজ অ্যাপার্টমেন্ট (১৫ম তলা), কালভার্ট রোড, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত ।
প্রধান উপদেষ্টা: ফিরোজ আহমেদ ( সাবেক সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় )
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: ডাঃ মো: হারুনুর রশীদ
সম্পাদক ও প্রকাশক মো. খয়রুল ইসলাম চৌধুরী ইউরোপ মহাদেশ বিষয়ক সম্পাদক- প্রফেসর জাকি মোস্তফা (টুটুল)
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২, ফায়েনাজ অ্যাপার্টমেন্ট (১৫ম তলা), কালভার্ট রোড, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ০২-৯৫৬২৮৯৯ মোবাইল: ০১৬৭০-২৮৯২৮০ ই-মেইল : swadhinbangla24@gmail.com