বাংলার জন্য ক্লিক করুন
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   ইসলামী জগত -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
জুমার দিনের আদব-শিষ্টাচার

 সপ্তাহের অন্য কোনো দিনের চেয়ে জুমাবারের গুরুত্ব বেশি। জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়েছে। জুমার দিনের সওয়াব ও মর্যাদা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো। এ দিন ইসলামের ইতিহাসে বড় বড় ও মহৎ কিছু ঘটনা ঘটেছে। জুমার গুরুত্ব আল্লাহ তাআলার কাছে এতোখানি যে, কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরাও নাজিল করা হয়েছে।
সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হওয়ার কারণে জুমার দিনের বিশেষ কিছু আদব ও শিষ্টাচার রয়েছে। কিছু জুমার আগে, কিছু মসজিদের, কিছু খুতবার সময়ের আর কিছু নামাজের আগে-পরের।

সেগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা-
এক. জুমার দিন গোসল করা। যাদের উপর জুমা ফরজ তাদের জন্য এ দিনে গোসল করাকে রাসুল (সাঃ) ওয়াজিব করেছেন (বুখারি, হাদিস নং: ৮৭৭, ৮৭৮)।
পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসাবে সেদিন নখ ও চুল কাঁটা একটি ভালো কাজ।
দুই. জুমার নামাজের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৮০)
তিন. মিস্ওয়াক করা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১০৯৮; বুখারি, হাদিস নং: ৮৮৭)
চার. গায়ে তেল ব্যবহার করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৮৩)
পাঁচ. উত্তম পোশাক পরিধান করে জুমা আদায় করা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১০৯৭)
ছয়. মুসুল্লিরা ইমামের দিকে মুখ করে বসা। (তিরমিজি, হাদিস নং:৫০৯, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১১৩৬)
সাত. মনোযোগ সহ খুতবা শোনা ও চুপ থাকা- এটা ওয়াজিব। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৪, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৭)
আট. আগে ভাগে মসজিদে যাওয়া। (বুখারি, হাদিস নং:৮৮১, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫০)
নয়. পায়ে হেঁটে মসজিদে গমন। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৪৫)
দশ. জুমার দিন ফজরের নামাজে ১ম রাকাতে সুরা সাজদা (সুরা নং ৩২) আর ২য় রাকাতে সুরা দাহর (সুরা নং : ৭৬) পড়া। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৯১, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৭৯)
এগারো. সুরা জুমা ও সুরা মুনাফিকুন দিয়ে জুমার নামায আদায় করা। অথবা সুরা আলা ও সুরা গাশিয়া দিয়ে জুমা আদায় করা। (মুসলিম, হাদিস নং: ৮৭৭)
বারো. জুমার দিন ও জুমার রাতে বেশি বেশি দুরুদ পড়া। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১০৪৭)
তেরো. এ দিন বেশি বেশী দোয়া করা।। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৫)
চৌদ্দ. মসজিদে মুসুল্লিদের মাঝে ফাঁক করে সামনের দিকে এগিয়ে না যাওয়া। (বুখারি, হাদিস নং:৯১০)
পনের. মুসুল্লিদের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের কাতারে আগানোর চেষ্টা না করা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৪৩)
ষোল. কাউকে উঠিয়ে দিয়ে, সেখানে বসার চেষ্টা না করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৯১১, মুসলিম, হাদিস নং: ২১৭৮)
সতের. খুতবা চলাকালীন সময়ে মসজিদে প্রবেশ করলে তখনও দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ সালাত আদায় করা ছাড়া না বসা। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩০)
আঠারো. জুমার দিন নামাজের আগে মসজিদে জিকর বা কোনো শিক্ষামুলক হালকা না করা। অর্থাৎ ভাগ ভাগ হয়ে, গোল গোল হয়ে না বসা, যদিও এটা কোনো শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হোক। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১০৮৯)
উনিশ. কেউ কথা বললে ‘চুপ করুন’ এটুকুও না বলা। (নাসায়ি, হাদিস নং: ৭১৪, বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৪)
বিশ. মসজিদে যাওয়ার আগে কাঁচা পেয়াজ, রসুন না খাওয়া ও ধূমপান না করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৫৩)
একুশ. ঘুমের ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে বসার জায়াগা বদল করে বসা। (আবু দাউদঃ ১১১৯)
বাইশ. ইমামের খুৎবা দেওয়া অবস্থায় দুই হাঁটু উঠিয়ে না বসা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১১১০, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১১৩৪)
তেইশ. খুতবার সময় ইমামের কাছাকাছি বসা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১১০৮)
চব্বিশ. জুমার দিন সুরা কাহফ পড়া। এতে পাঠকের জন্য আল্লাহ তাআলা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়কে আলোকিত করে দেন। (হাকেম, হাদিস নং: ২/৩৬৮, বায়হাকি, হাদিস নং: ৩/২৪৯)
পঁচিশ. জুমার আযান দেওয়া। অর্থাৎ ইমাম মিম্বরে বসার পর যে আযান দেওয়া হয় তা।(বুখারি, হাদিস নং: ৯১২)
ছাব্বিশ. জুমার ফরজ নামায আদায়ের পর মসজিদে ৪ রাকাত সুন্নাত আদায় করা। (বুখারি, হাদিস নং: ১৮২, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৮১)
সাতাশ. যেখানে জুমার ফরজ আদায় করেছে, উত্তম হল ঐ একই স্থানে সুন্নাত না পড়া। অথবা কোনো কথা না বলে এখান থেকে গিয়ে পরবর্তী সুন্নাত সালাত আদায় করা। (মুসলিম, হাদিস নং: ৭১০, বুখারি, হাদিস নং: ৮৪৮)
আটাশ. খুতবার সময় খতিবের কোনো কথার সাড়া দেওয়া বা তার প্রশ্নের জবাব দানে শরিক হওয়া জায়েজ। (বুখারি, হাদিস নং: ১০২৯, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৯৭)
ঊনত্রিশ. হানাফি আলেমগন বলেছেন, ভিড় প্রচ- হলে সামনের মুসুল্লির পিঠের ওপর সেজদা দেওয়া জায়েজ। (আহমাদ, হাদিস নং: ১/৩২)। প্রয়োজনে পায়ের ওপরও দিতে পারবে। (আর রাউদুল মুরবি)
ত্রিশ. ইমাম সাহেব মিম্বরে এসে হাজির হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইস্তিগফার ও কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকা।

 

জুমার দিনের আদব-শিষ্টাচার
                                  

 সপ্তাহের অন্য কোনো দিনের চেয়ে জুমাবারের গুরুত্ব বেশি। জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়েছে। জুমার দিনের সওয়াব ও মর্যাদা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো। এ দিন ইসলামের ইতিহাসে বড় বড় ও মহৎ কিছু ঘটনা ঘটেছে। জুমার গুরুত্ব আল্লাহ তাআলার কাছে এতোখানি যে, কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরাও নাজিল করা হয়েছে।
সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হওয়ার কারণে জুমার দিনের বিশেষ কিছু আদব ও শিষ্টাচার রয়েছে। কিছু জুমার আগে, কিছু মসজিদের, কিছু খুতবার সময়ের আর কিছু নামাজের আগে-পরের।

সেগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা-
এক. জুমার দিন গোসল করা। যাদের উপর জুমা ফরজ তাদের জন্য এ দিনে গোসল করাকে রাসুল (সাঃ) ওয়াজিব করেছেন (বুখারি, হাদিস নং: ৮৭৭, ৮৭৮)।
পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসাবে সেদিন নখ ও চুল কাঁটা একটি ভালো কাজ।
দুই. জুমার নামাজের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৮০)
তিন. মিস্ওয়াক করা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১০৯৮; বুখারি, হাদিস নং: ৮৮৭)
চার. গায়ে তেল ব্যবহার করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৮৩)
পাঁচ. উত্তম পোশাক পরিধান করে জুমা আদায় করা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১০৯৭)
ছয়. মুসুল্লিরা ইমামের দিকে মুখ করে বসা। (তিরমিজি, হাদিস নং:৫০৯, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১১৩৬)
সাত. মনোযোগ সহ খুতবা শোনা ও চুপ থাকা- এটা ওয়াজিব। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৪, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫৭)
আট. আগে ভাগে মসজিদে যাওয়া। (বুখারি, হাদিস নং:৮৮১, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৫০)
নয়. পায়ে হেঁটে মসজিদে গমন। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৪৫)
দশ. জুমার দিন ফজরের নামাজে ১ম রাকাতে সুরা সাজদা (সুরা নং ৩২) আর ২য় রাকাতে সুরা দাহর (সুরা নং : ৭৬) পড়া। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৯১, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৭৯)
এগারো. সুরা জুমা ও সুরা মুনাফিকুন দিয়ে জুমার নামায আদায় করা। অথবা সুরা আলা ও সুরা গাশিয়া দিয়ে জুমা আদায় করা। (মুসলিম, হাদিস নং: ৮৭৭)
বারো. জুমার দিন ও জুমার রাতে বেশি বেশি দুরুদ পড়া। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১০৪৭)
তেরো. এ দিন বেশি বেশী দোয়া করা।। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৫)
চৌদ্দ. মসজিদে মুসুল্লিদের মাঝে ফাঁক করে সামনের দিকে এগিয়ে না যাওয়া। (বুখারি, হাদিস নং:৯১০)
পনের. মুসুল্লিদের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের কাতারে আগানোর চেষ্টা না করা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৪৩)
ষোল. কাউকে উঠিয়ে দিয়ে, সেখানে বসার চেষ্টা না করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৯১১, মুসলিম, হাদিস নং: ২১৭৮)
সতের. খুতবা চলাকালীন সময়ে মসজিদে প্রবেশ করলে তখনও দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ সালাত আদায় করা ছাড়া না বসা। (বুখারি, হাদিস নং: ৯৩০)
আঠারো. জুমার দিন নামাজের আগে মসজিদে জিকর বা কোনো শিক্ষামুলক হালকা না করা। অর্থাৎ ভাগ ভাগ হয়ে, গোল গোল হয়ে না বসা, যদিও এটা কোনো শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হোক। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১০৮৯)
উনিশ. কেউ কথা বললে ‘চুপ করুন’ এটুকুও না বলা। (নাসায়ি, হাদিস নং: ৭১৪, বুখারি, হাদিস নং: ৯৩৪)
বিশ. মসজিদে যাওয়ার আগে কাঁচা পেয়াজ, রসুন না খাওয়া ও ধূমপান না করা। (বুখারি, হাদিস নং: ৮৫৩)
একুশ. ঘুমের ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে বসার জায়াগা বদল করে বসা। (আবু দাউদঃ ১১১৯)
বাইশ. ইমামের খুৎবা দেওয়া অবস্থায় দুই হাঁটু উঠিয়ে না বসা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১১১০, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১১৩৪)
তেইশ. খুতবার সময় ইমামের কাছাকাছি বসা। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১১০৮)
চব্বিশ. জুমার দিন সুরা কাহফ পড়া। এতে পাঠকের জন্য আল্লাহ তাআলা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়কে আলোকিত করে দেন। (হাকেম, হাদিস নং: ২/৩৬৮, বায়হাকি, হাদিস নং: ৩/২৪৯)
পঁচিশ. জুমার আযান দেওয়া। অর্থাৎ ইমাম মিম্বরে বসার পর যে আযান দেওয়া হয় তা।(বুখারি, হাদিস নং: ৯১২)
ছাব্বিশ. জুমার ফরজ নামায আদায়ের পর মসজিদে ৪ রাকাত সুন্নাত আদায় করা। (বুখারি, হাদিস নং: ১৮২, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৮১)
সাতাশ. যেখানে জুমার ফরজ আদায় করেছে, উত্তম হল ঐ একই স্থানে সুন্নাত না পড়া। অথবা কোনো কথা না বলে এখান থেকে গিয়ে পরবর্তী সুন্নাত সালাত আদায় করা। (মুসলিম, হাদিস নং: ৭১০, বুখারি, হাদিস নং: ৮৪৮)
আটাশ. খুতবার সময় খতিবের কোনো কথার সাড়া দেওয়া বা তার প্রশ্নের জবাব দানে শরিক হওয়া জায়েজ। (বুখারি, হাদিস নং: ১০২৯, মুসলিম, হাদিস নং: ৮৯৭)
ঊনত্রিশ. হানাফি আলেমগন বলেছেন, ভিড় প্রচ- হলে সামনের মুসুল্লির পিঠের ওপর সেজদা দেওয়া জায়েজ। (আহমাদ, হাদিস নং: ১/৩২)। প্রয়োজনে পায়ের ওপরও দিতে পারবে। (আর রাউদুল মুরবি)
ত্রিশ. ইমাম সাহেব মিম্বরে এসে হাজির হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইস্তিগফার ও কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকা।

 

কানটার জবাব দিবেন একাধিক মসজিদের আযান শুনলে?
                                  

 আজান আরবি শব্দ। أَذَان‎‎ (অথবা আযান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় যেমন: আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, এবং তুর্কমেনিস্তান, ইজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় তুরস্ক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, উজবেকিস্তান আযান হিসেবে উচ্চারণ করা হয়।
মুয়াজ্জিন কর্তৃক প্রার্থনার উদ্দেশ্য দিনের নির্ধারিত সময়ে ৫ বার আহবান করাকে আযান বলা হয়। সংজ্ঞা: ‘আজান’ অর্থ, ঘোষণা ধ্বনি (الإعلام)।
পারিভাষিক অর্থ, শরীআত নির্ধারিত আরবি বাক্য সমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচ্চকণ্ঠে সালাতে আহবান করাকে ‘আজান’ বলা হয়। ১ম হিজরি সনে আযানের প্রচলন হয়।ʾ
আজান শব্দের মূল অর্থ দাড়ায় أَذِنَ ডাকা,আহবান করা। যার মূল উদ্দেশ্য হল অবগত করানো। এই শব্দের আরেকটি বুৎপত্তিগত অর্থ হল ʾআজুন। (أُذُن), যার অর্থ হল ‘শোনা’।
পবিত্র কুরআনে মোট পাঁচ স্থানে أذان শব্দটি এসেছে। এর মাহাত্ম্য হচ্ছে আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছে। তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান।
অনেক সময় একই সাথে বিভিন্ন মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, সে ক্ষেত্রে কখনো দেখা যায় কোনো মসজিদের আযান প্রায় শেষের দিকে আবার কোনো মসজিদের আযান শুরুর দিকে, এ ক্ষেত্রে কোনটার জবাব দিব আমরা?
একই সাথে যদি বিভিন্ন মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন শুধু মহল্লার মসজিদের আজানের নিয়তে জবাব দিলে যথেষ্ট হয়ে যাবে, আর যদি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক আযান হতে থাকে, তখন সে ক্ষেত্রে প্রথম আজানের জবাব দেওয়াই উত্তম, চাই সেটা মহল্লার মসজিদ হোক বা না হোক।
সূত্র: রদ্দুল মুহতার ১/৩৯৬ মাকতাবায়ে আশরাফিয়া। আহসানুল ফতুয়া ২/২৯২ মাকতাবায়ে থানবী। ফতোয়ায়ে আলমগীরী ১/৫৭ মাকতাবায়ে জাকারিয়া। মুফতি জিয়াউদ্দিন গালিব।

 

জীবদ্দশায় বা মরণোত্তর দেহ-অঙ্গ দান প্রসঙ্গে ইসলাম যা বলে
                                  

মুফতী আবু তাহের মিসবাহ: জীবদ্দশায় বা মরণোত্তর নিজের শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অন্যকে দেওয়া জায়েজ আছে কি?
ইসলামি শরিয়তে মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মালিক সে নিজে নয়। এর মালিক আল্লাহ তায়ালা। সে জন্য কারো জন্যই নিজের রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রয় করা জায়েজ নয়। রক্ত দান করা যায়, এটা জায়েজ আছে। কিন্তু বিক্রয় করা হারাম। চক্ষু বা অন্যান্য অঙ্গ দান সাধারণত জায়েজ নয়।


কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যুই মানুষের শেষ নয়। এরপরও তার পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবন আছে। তা ছাড়া মৃত ব্যক্তির প্রচ্ছন্ন একটি অনুভূতি শক্তিও থাকে। সে আশেপাশের লোকজনকে বুঝতে পারে। শরিয়ত বিরোধী কাজ, বেপর্দা, সীমাতিরিক্ত বিলাপ, কান্নাকাটি তাকে কষ্ট দেয়। জোরে নড়াচড়া, অধিক ঠান্ডা বা অধিক গরম পানি ব্যবহারে তার কষ্ট হয়। জানাজা নিয়ে বেশি ছুটাছুটি, ঝাঁকুনি ও আঘাত সে অনুভব করে। কবর থেকে লোকজন চলে যাওয়ার সময় সে পায়ের আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পায়।
এমন একজন মৃত ব্যক্তির সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যদি সে দান করে যায় আর মৃত্যুর পরই ছয় ঘন্টার মধ্যে ডাক্তার এসে তার চোখ খুলে নেয়, হার্ট খুলে নেয়, লিভার খুলে নেয়, তাতে মৃত ব্যক্তির কী পরিমাণ কষ্ট হবে, তার বলার অপেক্ষা রাখেনা। উন্নত বিশ্বে এখন শরীরের ভেতর বাহিরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গই ব্যবহার যোগ্য।


এমতাবস্থায় শরীরের সব অঙ্গ খুলে নিয়ে গেলে দাফন করা হবে কাকে? এ অবস্থাটি মৃত ব্যক্তির জন্য কী পরিমাণ কষ্টের হবে? আর তার স্ত্রী ছেলে কন্যা ও সকল আত্মীয়ের জন্য কতটুকু বেদনার হবে তা ভেবে দেখা দরকার। এ জন্যই শরিয়ত এসব দান সমর্থন করে না। একান্ত ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো মাসআলা যদি সামনে আসে তা হলে সবদিক বিবেচনা করে মুফতিগণ সুনির্দিষ্ট ফতুয়া দিতে পারেন।


সূত্র: সূরা বাকারাহ ২৬০ আয়াত, সূরা বনী ইসরাইল ৪৯,৯৮। জামেউল ফাতাওয়া, ইসলামি ফিকহ ও ফাতওয়া বিশ্বকোষ।

অত্যাচারীদের পরিণাম যেমন হবে
                                  

ইসলাম ধর্মে সব ধরনের অত্যাচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, হারাম। শুধু অত্যাচার নয়, অত্যাচারে সহযোগিতা এবং অত্যাচারীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাও হারাম। মানুষের ওপর অত্যাচার এমন এক ভয়াবহ গুনাহ, যার শাস্তি কোনো না কোনো উপায়ে দুনিয়ায় পেতে হয়। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখি ও প্রাণীর ওপর অত্যাচার করাও হারাম। এ ছাড়া অত্যাচারের ভয়ঙ্কর গুনাহর কারণে আখেরাতে দোজখে প্রবেশ করতে হবে।

অনেকে ধর্মপ্রাণ হিসেবে ধর্ম-কর্মে অগ্রগামী হলেও অন্যের ওপর অত্যাচারে পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে সহজ-সরল মানুষ, ধার্মিক, ধর্ম পালনে সচেষ্ট ও সচেতন এবং দুর্বলদের ওপর অত্যাচারকে অনেকেই অপরাধ মনে করি না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো আমরা এতে আনন্দও বোধ করি। মনে রাখা জরুরি প্রয়োজন যে, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন এমন এক অপরাধ-পাপ-গুনাহ, যা সাধারণত আল্লাহ মাফ করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই অত্যাচারিত অত্যাচারী ব্যক্তিকে মাফ না করেন। প্রকৃত ধার্মিকদের আরও মনে রাখতে হবে, শুধু নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজের নামই ধর্ম নয়, ধর্ম হচ্ছে দুটো বিষয়ের সমষ্টি, যার একটি হচ্ছে পালন করা এবং অপরটি হচ্ছে বর্জন করা। কোরআন ও হাদিসের আদেশগুলো মেনে চললেই ধর্ম পালন হবে না, আদেশগুলো মেনে চলার পাশাপাশি কোরআন ও হাদিসের নিষেধগুলোও বর্জন করতে হবে।


কোরআন ও হাদিসে অত্যাচার সম্পর্কীয় বর্ণনা:
পবিত্র কোরআনে সূরা ইবরাহিমে বলা হয়েছে, অত্যাচারীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও উদাসীন মনে করো না। তবে তিনি তাদের শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন। তাদের চক্ষুগুলো বিস্ফোরিত হবে, তারা মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে দৌড়াতে থাকবে, তাদের চোখ নিজেদের দিকে ফিরবে না এবং তাদের হৃদয় দিশেহারা হয়ে যাবে।
মানুষকে আজাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও, যেদিন তাদের কাছে আজাব আসবে, সেদিন অত্যাচারীরা বলবে, হে আমাদের প্রভু! অল্প সময়ের জন্য আমাদের অবকাশ দিন, তা হলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (অন্যের ওপর অত্যাচার করব না) এবং রাসূলদের অনুসরণ করব। তোমরা কী ইতোপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই! যাঁরা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করছ এবং সেসব অত্যাচারীদের সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি’। -আয়াত ৪২-৪৫


সূরা আশ-শুআরার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘অত্যাচারীরা তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন?’ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা অত্যাচারীকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন যে, তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি অত্যাচারে লিপ্ত জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন। তার পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।-সহিহ বোখারি ও মুসলিম


অত্যাচার করে থাকলে দুনিয়াতেই যা করা দরকার:
হজরত রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কেউ যদি তার কোনো ভাইয়ের সম্মানহানি কিংবা কোনো জিনিসের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই (দুনিয়াতেই) তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেওয়া উচিত (অর্থাৎ ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত, ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত) এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যেদিন টাকা-কড়ি দিয়ে কোনো প্রতিকার করা যাবে না। বরং তার কাছে কোনো নেক আমল থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ হিসেবে মজলুমকে ওই নেক আমল দিয়ে দেওয়া হবে এবং তার কোনো অসৎ কাজ না থাকলেও ওই মজলুমের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তানো হবে। -সহিহ বোখারি


মুসনাদে আহমদে বর্ণিত এক হাদিসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর বান্দারা খালি পায়ে নগ্ন দেহে ময়দানে সমবেত হবে। এ সময়ে গুরুগম্ভীর স্বরে একটি আওয়াজ ধ্বনিত হবে। যা দূরের ও কাছের সবাই শুনতে পাবে। বলা হবে, আমি সবার অভাব পূরণকারী রাজাধিরাজ, কোনো জান্নাতবাসীর পক্ষে জান্নাতে যাওয়া এবং জাহান্নামবাসীর পক্ষে জাহান্নামে যাওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তার কৃত অত্যাচারের আমি প্রতিশোধ না নিই, এমনকি তা যদি একটি চড়-থাপ্পড় বা লাথির পর্যায়েও হয়ে থাকে। তোমার প্রভু কারও ওপর অত্যাচার করেন না। আমরা বললাম হে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সেটা কীভাবে সম্ভব হবে, আমরা তো সবাই খালি পায়ে ও নগ্ন দেহে থাকব? তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রত্যেকের কৃত সৎ কর্ম ও অসৎ কর্মের আদান-প্রদান দ্বারাই প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তোমাদের প্রতিপালক অত্যাচারী নন।


অপর এক হাদিসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একটি বেতের আঘাতের জন্যও কিয়ামতের দিন প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
অত্যাচার থেকে বাঁচার উপায়:
অত্যাচার থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে- সব ধরনের লোভ, হিংসা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রোধ থেকে আত্মসংবরণ করা এবং বেশি বেশি জনসেবা করা। ধর্মীয় সেবা ও পরোপকারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা আর হালাল ও বৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থে, হালাল টাকা-পয়সার মাধ্যমে পানাহারে, পোশাক-পরিচ্ছেদে ও আসবাবপত্রে সন্তুষ্ট থাকা। বিশেষ করে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা, কোরআন ও হাদিস পড়া এবং কোরআন ও হাদিসে অত্যাচার সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আছে, তা জানা, মানা এবং অন্যকে জানানোর চেষ্টা করা।
আমরা প্রকৃতই আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হলে, জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাসী হলে, দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পেতে চাইলে সব ধরনের অত্যাচার এবং জুলুমের সহযোগিতা করা থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।


এক্ষেত্রে আরও মনে রাখতে হবে- স্ত্রী, ভাই, বোনসহ নিকটাত্মীয়দের প্রাপ্য হক (ধর্ম কর্তৃক নির্ধারিত) না দেওয়াও অত্যাচার।
মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সব ধরনের অত্যাচার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার তৌফিক দান করুন, আল্লাহুম্মা আমিন। লেখক: সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী মাজার জামে মসজিদ, সিলেট।

 

সুখী ও ভালোবাসাময় দাম্পত্য জীবনের কিছু পাথেয়
                                  

 উস্তাদ নোমান আলি খান: বোন! আপনি আপনার স্বামীর সাথে দীর্ঘ জীবনের জন্য জড়িয়ে গেছেন। সুতরাং তাদের প্রতি রাগান্বিত হবেন না, তাদেরকে ভালোবাসুন। বিশ্বাস করুন, আপনার ভালোবাসায় যদি তিনি সুখী হন তবে আপনি প্রকৃতপক্ষেই সুখী হবেন। আপনি হয়তো ভাববেন, “আমি যেহেতু রাগান্বিত, তাহলে সে সুখে থাকবে কেন? সে আমাকে কেয়ার করে না, আমি কেন তাকে কেয়ার করবো?” আপনার স্বামীও কিন্তু একই রকম চিন্তা করেন, “আমার স্ত্রী আমার ব্যাপারে কেয়ার নেয় না আমি কেন তার ব্যাপারে কেয়ার নেবো?” বোন, আপনিই প্রথমে শুরু করুন। তার প্রতি যত্নবান হোন, সুন্দর হোন। তার দিকে তাকিয়ে হাসুন। দেখুন তার আগ্রহ বেড়ে যাবে! তিনি বলবেন, “তুমি হাসছো কেন? কেন হাসছো? সব কিছু ঠিক আছে তো? তোমার মা আসছেন নাকি বাড়িতে?” আপনিই শুরু করুন।

বাইরে যাওয়ার জন্য সাজবেন না, আপনার স্বামীর জন্য সাজুন। আপনার চার-পাঁচজন সন্তান আছে, সেটা কোন ব্যাপার না, তবুও স্বামীর জন্য সাজুন। বাইরে চারপাশে শয়তান আর ফিতনা ছড়িয়ে আছে। আপনার স্বামীর আপনার মাঝেই সৌন্দর্য দেখা উচিৎ, বাইরের কোন কিছুর মাঝে নয়। আর স্বামীদের উচিত স্ত্রীদের কর্মের কৃতিত্ব দেওয়া, প্রশংসা করা, তাদের ভালোবাসার কথা বলা। সব সময় অভিযোগ করবেন না এই বলে যে, “বাচ্চারা কোথায়?”, “খাবার রেডি হয়েছে?”, “এটা করেছো?”, “সেটা করেছো?”ৃ এত অভিযোগের রেশে স্ত্রী হয়তো বলে বসবেন, “আমি কিছুই করিনি।” আর আপনি সে সুযোগে বলবেন, “তুমি আমার কোন কথাই শুনো না!” বন্ধ করুন ভাই, এত অভিযোগ করবেন না, “খাবারে লবণ বেশি কেন?”, “খাবার ঠান্ডা কেন?”, “বেশি গরম কেন?” ৃ বন্ধ করুন ভাই, বন্ধ করুন। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ভালো কিছু বলুন, সুন্দর কিছু বলুন। আমি জানি আমাদের কালচারে, বিশেষত বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়াতে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ভালো কিছু বলাটা খুবই কঠিন, ভালো কিছু বললেই যেন বুকের বামপাশে ব্যাথায় চিনচিন করে উঠে! তাই ভালো কিছু বলার পর সেটাকে ব্যালান্স করার জন্য মন্দ কিছুও যেন বলতে হয় তখন! যেমন খাবার ভালো হলে প্রশংসা করলেন আর বললেন, “খাবার অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু আমি এখনো তোমার মাকে খুব একটা পছন্দ করি না!” যেন ভালো কিছুর সাথে মন্দ কিছুও বলতে হয় ভারসাম্য করার জন্য। না, এরকম করবেন না। এই আয়াতে বলা হয়েছে, “হে আল্লাহ, আমাদের জন্য আমাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদেরকে চক্ষুশীতলকারী করে দিন।” [সূরা আল-ফুরকান, ২৫ঃ ৭৪] আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তান থেকে এতোটা সুখ চাচ্ছি যেন এটা আমাদেরকে আনন্দের কান্নায় বইয়ে দেয়। এটা কীভাবে সম্ভব যে আপনি এত কিছু পাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করবেন কিন্তু আপনি নিজে কোন কাজই করবেন না সেটা পাবার জন্য? না, এভাবে হবে না।

আপনি দু’আ করবেন, “হে আল্লাহ, আমাকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়ে দাও (রাব্বি জায়ালনি মুকিমাসসালাতি)” আর ঐদিকে আযান দিচ্ছে অথচ আপনি চেয়ারে হেলান দিয়ে দু’আ করেই যাচ্ছেন। আল্লাহ তো আপনার জন্য ফেরেশতা পাঠাবে না যে তারা আপনাকে শূন্যে ভাসিয়ে সালাতে নিয়ে যাবে, আপনাকে রুকু-সিজদা করিয়ে দেবে! বরং আপনি দু’আ করুন আর তার সাথে চেষ্টা করতে থাকুন। তদ্রুপ আপনি দু’আ করবেন আর তাৎক্ষণিকভাবে আপনার স্ত্রী আপনাকে ভালোবাসবে এমনটা কাজে দেবে না। আপনাকেও তার প্রতি ভালোবাসা দেখাতে হবে ভাই। তাকে ভালোবাসুন। এটাই হবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই উম্মাহর জন্য ‒ মুসলিম পরিবারগুলোর বন্ধনকে দৃঢ় করা। কারণ যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হয়, সেখানে সন্তানরা ঠিকমত বেড়ে উঠতে পারে না। মা এর সাথে যদি সন্তানের কোনো সমস্যা হয় সে বাবার কাছে যায়। বাবার সাথে কিছু হলে সন্তান মায়ের কাছে যায়। দু’জনের ঝগড়ার মাঝে সন্তানরা মানুষ হতে পারে না, ঠিকমত বেড়ে উঠতে পারে না। “হে আল্লাহ, আমাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী করে দিন।” [২৫ঃ৭৪] আমাদের কেনো উচিত একটি ভালো পরিবার তৈরি করা? কারণ আপনি যখন একজন ভালো স্বামী হবেন, আপনার ছেলেও তার দাম্পত্য জীবনে ভালো স্বামী হবে। আপনি যখন একজন গুণবতী স্ত্রী হবেন, আপনার মেয়েও সংসারজীবনে ভালো স্ত্রী হবে। আর যদি আপনারা ভালো না হোন, তাহলে আপনারাই তাদেরকে ভবিষ্যতের মন্দ পরিবার হিসেবে গড়ে তুলবেন আর এটা হবে আপনারই ভুলের জন্য; আপনিই এর জন্য দায়ী থাকবেন।

এজন্যই আমরা বলি, “আর আমাদেরকে মুত্তাকিদের ইমাম বানিয়ে দিন।” এর মানে প্রত্যেকটা পরিবারের ইমাম থাকেন, আর পরিবারের প্রধান হিসেবে আপনাকেই তাকওয়াশীল একটি পরিবার গড়ে তুলতে হবে। আপনাকে হতে হবে সেই তাকওয়াশীল পরিবারের ইমাম; কারণ আপনার পরিবারের ইমাম তথা নেতা তো স্বয়ং আপনি-ই। কেনো আমাকে মুত্তাকী পরিবার গড়ে তুলতে হবে? কারণ ইমাম হিসেবে হাশরের ময়দানে আপনার পরিবার আপনার সাথে থাকবে, তারা যদি আপনার কারণে কোন ভুল করে তবে এর দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে পরিবারের ইমাম হিসেবে। আপনাকে তাদের সাথে বাধা হবে, কারণ আপনি তাদের ইমাম হিসেবে তাদের প্রতি দায়িত্বে আবদ্ধ। কিন্তু আপনার সন্তানেরা যদি ভালো হয়, ভালো কাজ করে, আল্লাহর দ্বীনের সেবা করে, তবে তাদেরকে আল্লাহ উপরে তুলবেন, সম্মানিত করবেন। সাথে আপনাকেও আল্লাহ তাদের সঙ্গে সম্মানিত করবেন, উপরে তুলবেন। কারণ আপনি তাদের সাথেই বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছেন, আপনি তাদের ইমাম। আপনার একার সাওয়াব হয়তো আপনার জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে আর সে জন্য আমরা আমার সন্তান, তাদের সন্তান, তাদের সন্তান এভাবে বংশধরদের জন্য আল্লাহর কাছে চাই। আল্লাহ আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
নোমান আলী খান, প্রতিষ্ঠাতা, সি.ই.ও. এবং প্রধান উপদেষ্টা, “দ্য বাইয়্যিনাহ ইন্সটিটিউট ফর এ্যারাবিক এণ্ড কুর’আনিক স্টাডিজ”।

দ্রুত বিয়ে করতে কার্যকরী ৭ আমল
                                  

 আবদুল্লাহ তামিম: বিবাহ একটি সুন্নাত আমল। কে কখন বিবাহ করবে আল্লাহতায়ালা ভালো জানেন। আল্লাহতায়ালা চাইলেই সব কিছু সম্ভব।আল্লাহতায়ালা না চাইলে কোনো কিছু সম্ভব না। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যাদের বিবাহের বয়স অতিক্রম করলেও তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছেন না। ছেলে বা মেয়ে বিবাহের ক্ষেত্রে তারা যদি প্রস্তাব পেয়েও তাদের বিবাহ না হয় তাহলে তাদের জন্য কার্যকরি ৭টি দোয়া আমরা আমলের জন্য উপস্থাপন করেছি। কিছু লোক খুব ভাগ্যবান, যারা বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে তাড়াতাড়ি তাদের বিবাহও হয়ে যায়। অনেক মানুষ এমন আছে যারা প্রস্তাবের পর আর বিবাহ হয় না। আর কেউ কেউ বিবাহের প্রস্তাব না পেয়ে হতাশ হয়ে যায়। হতাশ হওয়া উচিত নয়, হতাশ হবেন না। প্রতিক্ষা করলে বিলম্বে আল্লাহতায়ালা ভালোটা ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কারণ আল্লাহ সবসময় আপনার জন্য সেরাটা চান। আমরা যে ৭টি আমল উল্লেখ করছি, সবসময় নিয়ম মত তা আমল করলে আল্লাহ চাহে তো খুব শীঘ্রই একটি বিয়ের প্রস্তাব পাবেন আপনি।


১. সূরা ইয়াসিন পাঠ করা
সূরা ইয়াসিন কুরআনের অন্তর হিসেবেও পরিচিত। কারণ, তার রয়েছে সীমাহীন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট। সূরা ইয়াসিন শীঘ্রই বিবাহ বিচ্ছেদের সাথে সম্পর্কিত সব সমস্যার সমাধান করে দেয়।
০২. সূরা দোহা ও কাসাসের ২৪ আয়াত পাঠ
فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
সূরা কাসাসের ২৪ আয়াতে মুসা আ. এর বিশেষ আলোচনা করা হয়েছে। মূসা আ. খুব একাকী ও বিষণ্ণতা অনুভব করেছিলেন তখন তিনি এ আয়াতটি বেশি বেশি পাঠ করেছেন।
অনেক আলেমরাই এ আমলটি দিয়ে থাকেন। যদি কোনো ছেলে এই আয়াতটি ১০০ বার পাঠ করে, তাহলে শীঘ্রই তিনি তার জন্য একটি ভালো পাত্রী পাবেন বলে আশা করা যায়।
মেয়েদের সর্বোত্তম বিবাহ প্রস্তাব পেতে ফজরের নামাজে ১১ বার সূরা দোহা পাঠ করে দোয়া করা।
৩. আল্লাহ নামের জিকির
প্রথমে আমলটি করার শুরুতে ১১ বার দরুদ শরিফ পাঠ করা। তারপর ৩১৩ বার আল্লাহ শব্দটি পাঠ করা।
শেষে আবারো ১১বার দরুদ শরিফ পাঠ করা। টানা ৪১ দিন বাদ না দিয়ে এ আমলটি করতে হবে।
৪. সূরা তাওবার ১২৯ নম্বর আয়াত পাঠ করা
فَإِن تَوَلَّوْاْ فَقُلْ حَسْبِيَ اللّهُ لا إِلَـهَ إِلاَّ هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
“এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।”
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর এ আমলটি করতে হবে। সঙ্গে ১৯বার বিসমিল্লাহ, ১১০০ বার সুরা তাওবার ১২৯ নম্বর আয়াত পাঠ করা। এরপর ১০০বার দরুদ শরিফ পাঠ করা। শেষে ১০০বার আবারো বিসমিল্লাহ পড়তে হবে।
৫. সূরা মরিয়ম পড়া
সূরা মরিয়ম কোন এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে পড়া। যে মেয়ের বা ছেলের বিবাহ নিয়ে সমস্যা সে পড়বে বা তাদের বাবা মা পড়বে।
৬. হযরত ফাতেমা রা. তাসবিহ পাঠ করা
২ রাকাত নামাজ আদায় করে কুরআন তিলাওয়াত করে ১১ বার দরুদ শরিফ পড়বে। তারপর ফাতেমা রা. এর তাসবিহ পাঠ করবে।
ফাতেমা রা. এর তাসবিহ হলো ৩৪ বার আল্লাহ ও আকবার পড়বে। ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়ে শেষে ১১বার দরুদ শরিফ পড়বে।
তারপর সুরা পাঠ করবে। প্রথমে সুরা দোহা, সুরা শুআরা, সুরা কাসাস, সুরা ইয়াসিন তারপর আবারো সুরা শুআরা পাঠ করবে। উল্লেখ্য এ আমল পাত্রের পিতা -মাতা করতে পারবে বা তারা নিজেরাই।
৭. সূরা মুজাম্মিল পাঠ করা


যদি কোন মেয়ে বড় হয়ে যায়, কোন বিয়ের প্রস্তাব না পায় তাহলে একজন মা বাবা শুক্রবার দিনে জুম্মার নামাযের পর ২ রাকাআত নামাজ আদায়ের পর সূরা মুজাম্মিলের ২১ বার পড়তে হবে।
সূত্র: দ্যা ইসলামিক ইনফরমেশন।

পাখিদের প্রতি নবীজীর ভালোবাসা
                                  

প্রকৃতীর সৌন্দর্য বাড়াতে নানা জাতের পাখি আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। রূপ ছড়িয়ে দিয়েছেন পাখির ডানায় ডানায়। শুধু স্রস্টার আনুগত্যে নয়, পাখির সৌন্দযের্র কারণেই পাখির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মায়। শিশুর কোমল হৃদয়ে পাখির প্রতি ভালোবাসা, বাউলের গানে পাখির সুর, কবিতার পক্সিক্তমালাও পাখির উপমা।


ভোরের আলো জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যারা কর্মমুখর দিনকে স্বাগত জানায়, সেই প্রকৃতীবান্ধব পাখিদের প্রতি মানুষকে সহানুভূতিশীল করে তোলার জন্য পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহপাক পাখি প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। হজরত ইব্রাহিম, ইউসুফ, দাউদ, সোলায়মান এবং ঈসা (আ.) -এর কাহিনীতে পাখির বিবরণ রয়েছে। হুদহুদ নামের একটি পাখি ছিল হজরত সোলায়মান (আ.) -এর বিশ্বস্ত গুপ্তচর ও সংবাদবাহক। কোরআনে রয়েছে, সোলায়মান বিহঙ্গদলের সন্ধান নিয়ে বলল, ‘ব্যাপার কী! হুদহুদকে দেখছি না যে। সে অনুপস্থিত নাকি? সে উপযুক্ত কারণ না দর্শালে আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা জবেহ করব। অবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা অবগত নন আমি তা অবগত হয়েছি এবং ‘সাবা’ থেকে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি এক নারীকে দেখলাম ওদের ওপর রাজত্ব করছে। তাকে সবকিছু দেয়া হয়েছে এবং তার রয়েছে এক বিরাট সিংহাসন।’ (সূরা নামল, আয়াত ২০-২৩)। পাখিদের থেকে শিক্ষাগ্রহণে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি লক্ষ্য করে না আকাশের শূন্যগর্ভে নিয়ন্ত্রণাধীন বিহঙ্গের প্রতি? আল্লাহই ওদের স্থির রাখেন। অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য’ (নাহল ৭৯)।

এ প্রসঙ্গেই অন্য একটি সূরায় বলা হয়েছে, ‘তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের ঊর্ধ্বদেশে বিহঙ্গকুলের প্রতি যারা পথ বিস্তার ও সঙ্কুচিত করে? দয়াময় আল্লাহই ওদের স্থির রাখেন। তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা।’নবী (সা.) প্রকৃতীর নন্দিত সন্তান পাখিদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আল্লাহর এ অনুপম সুন্দর সৃষ্টির প্রতি ছিল তার গভীর আকর্ষণ এবং অনুকম্পা। শুধু তাই নয়, আল্লাহর প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি ছিল তার অগাধ প্রেম ও ভালোবাসা। একদিন আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তাঁর সাহাবাদের নিয়ে বসে ইসলামকে মানবতার দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার জন্য পরামর্শ করছিলেন। এমন সময় একজন সাহাবি একটি পাখির কয়েকটি বাচ্চা ধরে নিয়ে উপস্থিত হলেন। আর সেই সাহাবির মাথার ওপর দিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মা পাখিটি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে আসছিল। নির্মম দৃশ্যটি সৃষ্টিকুলের মহান বন্ধু আল্লাহর নবী (সা.) -এর দৃষ্টিগোচর হতেই তাঁর অন্তর যেন অজানা ব্যথায় ব্যথিত হল। সন্তানহারা মা পাখিটির আহাজারি যেন নবীজীর কোমল হৃদয়ে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। নবী (সা.) সাহাবাকে একান্তভাবে কাছে ডেকে নিলেন, আন্তরিকতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে ঘটনাটা মনোযোগের সঙ্গে শুনলেন। তারপর সে সাহাবা দয়ার নবীর কষ্ট পাওয়া চেহারা দেখেই বিষয়টি আঁচ করেন। নবী (সা.) সাহাবাকে পাখিটি রেখে আসার কথা বলতেই সাহাবা দ্রুত হেঁটে স্বস্থানে পাখির বাচ্চাগুলো রেখে আসেন।

হজরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, আমি নবী করিম (সা.) -কে বলতে শুনেছি, ‘হতভাগ্য খারাপ প্রকৃতীর লোকের দিল থেকে দয়া-করুণা কেড়ে নেয়া হয়।’পাখির প্রতি নবী (সা.) -এর এ দরদমাখা ভালোবাসা আমাদের কী শিক্ষা দেয়! ইদানীং বিশ্বব্যাপী পাখিপ্রেমীদের কর্মকা- নিরীহ এ জীবটির প্রতি মানুষের অনুরাগ বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। পাখিদের প্রতি জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের বংশবৃদ্ধি এবং সংরক্ষণে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করে এদের হত্যা ও উত্ত্যক্তকারীদের যথাযথ শাস্তির বিধান কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। এই শীতের মৌসুমে দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে থাকার জন্য আসে, কিন্তু তাদের প্রতি প্রতিবেশী মানুষ চালায় নির্মম অত্যাচার আর এ কারণে কোনো পাখি প্রাণ হারায় আর কোনোটি চরম ভয় পেয়ে চলে যায় স্বদেশে যে কারণে প্রকৃতী হারায় তার সৌন্দর্য।

মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলে রনি দাসের ইসলাম গ্রহণ
                                  

লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগমে বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাঁচকমলাপুর দারুল উলুম হাফেজিয়া কওমিয়া মাদ্রাসার ১৩তম ঐতিহাসিক তাফসিরুল কোরআন মাহফিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মহান বিজয় দিবসের দিন মাদ্রাসার পাশের বিশাল মাঠে অনুষ্ঠিত এ মাহফিলের মূল আকর্ষণই ছিলেন প্রধান বক্তা শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী।

চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান বিশিষ্ট সমাজসেবক আলহাজ্ব সাহিদুজ্জামান টরিকের আয়োজনে ঐতিহাসিক তাফসিরুল এ কোরআন মাহফিলে শরিক হতে গতকাল সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসতে থাকেন। বাস-ট্রাক, মাইক্রো-মিনিবাস, সিএনজি-অটো, মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের ছোট-বড় যানবাহনযোগে মাহফিলে উপস্থিত হয়ে আলোচনা শোনেন কয়েক লাখ মানুষ। গতকাল দুপুরের পরপরই সড়কগুলোতে প্রচুর যানজটের সৃষ্টি হলেও ধর্মপ্রাণ মানুষেরা সেসব উপেক্ষা করেই পৌঁছান মাহফিলস্থলে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশালাকার প্যান্ডেলের প্রস্তুত রাখা হলেও মাঠ ছাপিয়ে দর্শক শ্রোতাদের জায়গা নিতে হয় আশপাশের সড়ক ও খালি জায়গায়।

বিকেল চারটা নাগাদ দেশের প্রায় ৩০ জেলা থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অংশগ্রহণে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মাহফিল-প্যান্ডেল। তবে মাহফিলের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় মাগরিবের নামাজের পর। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে প্যান্ডেলই আদায় করা হয় নামাজ ।

মাহফিলে পাঁচকমলাপুর দারুল উলুম হাফেজিয়া কওমিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ সভাপতির বক্তব্য দেন। এরপর বিশেষ বক্তা হিসেবে তাফসির পেশ করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, মুফাচ্ছিরে কোরআন হযরত মাওলানা মুফতি আলী আকবর। বেশ কিছু সময় তিনি কোরআন ও হাদিস থেকে বর্ণনা উপস্থাপন করে বক্তব্য দেন। রাত ৯টা নাগাদ মাহফিল ময়দানে এসে হাজির হন প্রধান বক্তা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত বক্তা, বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও কোরআন গবেষক শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী। তাকে কাছ থেকে একনজর দেখতে খানিকটা উত্তাল হয়ে ওঠে মাহফিলে উপস্থিত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।

তবে শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী মঞ্চে উঠে উপস্থিত সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে বয়ান শুরু করলে মুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে থাকা মানুষেরা নিশ্চুপ হয়ে তার কথাই বুদ হয়ে যান। টানা ১ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ধরে পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল নারীর মর্যাদা, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল, ইসলামের দাওয়াত ও মহান বিজয় দিবস। তবে এসবের মধ্যে তার আলোচ্য বিষয়ের মূল তাৎপর্য ঘিরে ছিলে ‘সুরা আদ্ দোহা’।

এর আগে মাহফিলের প্রধান অতিথি মাদ্রাসার পরিচালক, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট ও সাহিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সাহিদুজ্জামান টরিক তাকে মঞ্চে নিয়ে এসে উপস্থিত সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং উপস্থিতির উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে সবার সহযোগিতা চেয়ে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন, দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ, চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু, মাহফিলে দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম, পাড়া, মহল্লা থেকে আগত লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, নারী-পুরুষসহ অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ জনতার উপস্থিতি চোখে পড়ে। দেরিতে আসায় মাহফিল ময়দানে জায়গা না পেয়ে যেখানে-সেখানে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রধান বক্তার বক্তব্য উপভোগ করেন অনেকেই।

এ ছাড়া মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে ও আগত মহিলাদের জন্য প্রজেক্টরের মাধ্যমে সাদা পর্দায় মাহফিল পরিবেশন করা হয়। মাহফিলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিলেন পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ স্থানীয় কয়েক শ` স্বেচ্ছাসেবক। প্রধান বক্তা শায়খ মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্য রেকর্ড করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে মঞ্চের সামনে ক্যামেরা নিয়ে ভিড় করেন শতাধিক ইউটিউবার ও আইপি টিভিসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।

মাহফিলের আলোচনা শেষে মোনাজাতের আগমুহূর্তে পবিত্র কোরআনকে ভালোবেসে ও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উপস্থিত লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে পবিত্র কালেমা পড়ে রনি কুমার দাস নামের এক হিন্দু যুবক নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী তাকে পবিত্র কালেমা পাঠ করান। স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ওই যুবক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তার নাম রাখা হয়েছে আব্দুর রহমান। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জে। তিনি চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির দর্শন বিভাগের ছাত্র।

মসজিদ আবাদ হোক শিশুদের অংশগ্রহণে
                                  

 সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে শিশুদের মসজিদে গমন খুবই জরুরি। শিশুদের অনেকে মসজিদে আসতে চায়, কিন্তু অভিভাবক শিশুকে মসজিদ নিয়ে আসা থেকে বেঁচে থাকতে মিথ্যাসহ নানা অজুহাত দাঁড় করায়। যা কোনোভাবেই উচিত নয়, বরং শিশুর মসজিদে আসা এবং শিশুদের অংশগ্রহণে মসজিদ আবাদ হলে জাঁতি পাবে সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ।
মসজিদে শিশুদের নিয়ে এলে অনেক মুসল্লিই বিরক্ত হয়। আবার অনেকে শিশুদের নামাজের কাতার থেকে বের পেছনে পাঠিয়ে দেয়। যা ঠিক নয় বরং সুন্নাতের সরাসরি বিরোধী।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন থেকেই মুসলিম উম্মাহর এ শিক্ষা নেয়া জরুরি যে, তিনি মসজিদে শিশুদের নিয়ে আসতেন কিনা। কিংবা নামাজ পড়াকালীন সময়ে তিনি শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন। আর তাতেই রয়েছে সুন্দর উত্তর।


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় নাতি হজরত ইমাম হাসান ও হুসাইন নামাজ চলাকালীন সময়ে সেজদায় গেলে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাধে চড়তেন। যে কারণে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক সময় সেজদায় অনেক সময় ব্যয় করতেন। কখনও নাতিদের সঙ্গে রাগ বা খারাপ আচরণ করেননি।
বাচ্চা বা শিশুদের মসজিদমুখী করতে দেশে ও দেশের বাইরে নানা আয়োজনের খবর পাওয়া যায়। কোথাও মসজিদে গাছের বাগান করেছেন কোনো ইমাম। এক একটি গাছের টবে এক একজন বাচ্চা বা শিশুর নাম লিখে সে গাছের তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব দিয়েছেন সেই শিশুকে। ফলে সে মসজিদে আসবে আবার কুরআন শিখবে পাশাপাশি হবে নিয়মিত নামাজি। তার থেকে খারাপ বা বদ স্বভাব দূর হয়ে যাবে।


আবার ভারতে গত কিছুদিন আগে একাধারে ৪০ দিন নামাজের জামাআতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নতুন সাইকেল উপহার দেয়ার আয়োজন হয়েছিল। কারণ যে বা যারা নিয়মিত ৪০ দিন মসজিদে নামাজের জামাআতে অংশগ্রহণ করবে তাদের মাঝে নামাজের একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যাবে। অন্যায় ও অপরাধমুক্ত মনও তৈরি হয়ে যাবে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের নোয়াখালীর এক মসজিদের ইমাম জুমআর নামাজে ঘোষণা করলেন, ’১২ বছরের নিচে যত বাচ্চা মসজিদে আসবে প্রত্যেক ওয়াক্তে তাদের জন্য থাকবে ২টি করে চকলেট। আবার যারা নিয়মিত আসবে তাদের জন্য থাকবে সপ্তাহিক পুরস্কার। যা প্রতি বৃহস্পতিবার বাদ ইশা ঘোষণা করা হবে।’
বাচ্চাদের মসজিদমুখী করে নামাজি ও অপরাধমুক্ত সুন্দর জীবন গঠনে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এ ইমাম। যদিও ভেবেছিলাম হয়তো এ আহ্বানে তেমন সাড়া পাবো না।
আল্লাহর তাআলার শুকরিয়া, ইমামের এ ঘোষণায় এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই মসজিদে শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি চকলেট (৫৮) পাওয়া ৮ বছরের শিশু সালেহকে সাপ্তাহিক পুরস্কার হিসেবে জ্যামিতি বক্স দিয়েছেন মসজিদে এ ইমাম।


বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে মসজিদে ইমাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘শুধু নামাজ পড়ার জন্যই নয়, বরং মসজিদে নামাজ পড়ার পর তারা খেলবে, দৌড়াদৌড়ি করবে, আনন্দ করবে।’
ইমামের এ ঘোষণায় স্থানীয় কিছু মুসল্লি রেগে গেলেন আবার কেউ কেউ মারাত্মক বিরক্তি প্রকাশ করলেন। এ ব্যাপারে মসজিদের ইমামের ঘোষণা-
‘শিশুদের যারা সহ্য করতে পারবে না, তারা চাইলে অন্য মসজিদে চলে যেতে পারেন। আর যারা রেগে যাবেন তাদের নয়, যারা ধৈর্যশীল মুসল্লি, আমি শুধু তাদের ও শিশুদের ইমামতি করবো।’
কারণ শিশুরা ছোট থেকে নামাজে অভ্যস্ত হলে মসজিদ কখনো মুসল্লি শূন্য হবে না। যারা এখন শিশু, কম-বেশি দুষ্টুমি করলেও বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। তাদের বুঝানো এবং নামাজে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
শুধু ছেলে শিশুরাই নয়, মেয়ে শিশুরাও বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে মসজিদে আসা শুরু করে। এরইমধ্যে ৬ বছরের এক মেয়ে শিশু সবচেয়ে বেশি মসজিদে এসে চকলেটসহ সপ্তাহিক পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন অ্যালার্ম ঘড়ি।


দেশের প্রতিটি মসজিদে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়লে, শিশুদের দ্বারা মসজিদ আবাদ হলে কমে যাবে অপরাধ প্রবণতা। কুরআনের আলোয় আলোকিত হবে ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও দেশ।
সে কারণে মসজিদে শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবক ও বড়দের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। সে আলোকে মসজিদ চত্বরে শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক পার্ক বা জায়গাসহ খেলার সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। যা শিশুদের নৈতিক, মানসিক ও আত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি সত্য ও সুন্দরের দিকে পারিচালিত করবে।
আজকের শিশুই আগামী দিনের মসজিদের নামাজের জামাআতে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবন্দি হয়ে নামাজ আদায় করবে। সুন্দর, শান্তি ও নিরাপত্তার সুবাতাবাস বইবে সমাজ ও রাষ্ট্রে। আর তাদের পরকালও হবে সুন্দর।

কোরআন শরিফের কপি বেশ পুরোনো হলে যা করতে হবে
                                  

 আমাদের বাড়িতে কয়েকটি পুরোনো কোরআন শরিফ রয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির মসজিদেও কোরআন কারিমের পুরাতন বেশ কিছু কপি আছে। সেগুলো খুবই পুরোনো হয়ে গেছে। ফলে এখন আর পড়ার উপযুক্ত নেই। ভীষণ জরাজীর্ণ হয়ে এসেছে। আমার জানার বিষয় হলো, আমরা যদি কোরআনের পুরাতন কপিগুলো সরিয়ে নতুন কপি সরবরাহ করতে চাই, তাহলে আমাদের করণীয় কী? জানিয়ে উপকৃত করবেন। ধন্যবাদ।


পবিত্র কোরআনের পুরাতন কপিগুলো তেলাওয়াতের অনুপযুক্ত হয়ে গেলে যত্ন করে সরিয়ে নিতে হবে। এরপর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কাপড়ে পেঁচিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। তবে এমন জায়গায় দাফন (পুঁতে) করতে হবে, যেখানে মানুষের চলাচল নেই।


ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে, পবিত্র কোরআনের পাতা পুরাতন হয়ে গেলে, সাহাবায়ে কেরাম তা মাটিতে পুঁতে ফেলার আদেশ দিতেন। (ফাজাইলুল কোরআন, বর্ণনা : ৬৫)
আর যদি পুঁতে ফেলা সম্ভব না হয়, তাহলে ভারী কোনো বস্তুর সঙ্গে বেঁধে গভীর কোনো জলাশয়ে ডুবিয়ে দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কোরআনের সঙ্গে যেন কোনো ধরনের অসম্মানজনক কাজ না হয়।

সূত্র: রদ্দুল মুহতার: ১/১৭৭; আল-বিনায়া: ১৪/৫৮০; শরহুস সিয়ারিল কাবির; লিস-সারাখসি : ৩/১৪২; ফাতাওয়া সিরাজিয়া, পৃষ্ঠা: ৭১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১৮/৬৮; মুখতারাতুন নাওয়াজিল : ৩/৯৪

 

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলাম
                                  

 মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা শক্তিশালী জাঁতি গঠনের পূর্বশর্ত। তাই ইসলাম বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। জাহেলি আরবরা যে পৃথিবীর সর্বকালীন ইতিহাসের বর্বর অভিধা পেয়েছিল, তা ওই মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার কারণেই। জড়বাদী চিন্তা-চেতনা আর আকিদা-বিশ্বাস তাদের মানবিক বোধকে সম্পূর্ণ বিকল করে দিয়ে পাশবিক শক্তিকে এতটাই উসকে দিয়েছিল যে তারা ঐতিহাসিকভাবে বর্বর খেতাব পেয়েছে। জড়বাদ বীভৎসরূপে প্রকাশ পায় ভোগবাদিতার মাধ্যমে। ভোগের নেশা যখন কোনো মানুষের মধ্যে প্রবল হয়, তখন তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেতে থাকে। সে উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে।

অন্যকে চুষে, চিবিয়ে, দলিয়ে, পিষিয়ে, নিঃশেষ করে হলেও নিজের কার্যসিদ্ধি করাই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে তার তা-বলীলা গোটা সমাজকে অশান্ত করে তোলে। জাহেলি যুগে আরব সমাজের অবস্থা হয়েছিল তেমনই। আমরাও বা কম যাই কিসে! আমরা দেখেছি মদ্যপ মন্ত্রীপুত্রের আগ্নেয়াস্ত্রের টার্গেট হয়ে নিরীহ পথচারীর করুণ মৃত্যু। দেখেছি আইন প্রণেতা-সংসদ সদস্যের ছোঁড়া বুলেটে অবুঝ শিশুকে বিদ্ধ হতে। বানভাসি, ঝুপড়িবাসী, ছিন্নমূল অসহায় মানুষের জীবন রক্ষায় আসা বিদেশি সাহায্যের টিন চুরি, গম চুরি, ওষুধ চুরি ইত্যাদির কথা আর নাই বললাম। এসব আর কিছুই নয়, কেবল মানসিক স্বাস্থ্যহীনতারই কুফল। জড়বাদী ধ্যান-ধারণা অপরিহার্য পরিণতি। ভোগবাদী মানসিকতার প্রাপ্য প্রায়শ্চিত্ত। শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বীনি মিশনের প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল মানবজাতিকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলা। আর সে জন্যই মহানবী (সা.)-এর নবুয়তি জীবনের প্রথম এক যুগেরও বেশি সময় কেটে গেছে আরবদের ভোগের মোহমুক্ত করতে। জড়বাদী চিন্তা-চেতনার কবল থেকে তাদের রক্ষা করতে। আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে তুলে মুক্তবুদ্ধি আর সুস্থ বিবেকের সঙ্গে যুক্ত করতে। মদিনার জীবনে তাই অনুশাসনিক ভার আরোপ করে তাদের বুদ্ধিমুক্তির পথকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়নি। ইসলাম কখনো জোরপূর্বক তার অনুশাসন কারো ওপর চাপিয়ে দেয়নি। ইসলাম সব সময় মুক্তচিন্তা আর শুভবুদ্ধিকে উৎসাহী করেছে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য। ইসলাম শুধু পথ দেখিয়েছে অনন্ত-অসীমের সঙ্গে সংযোগের। ইরশাদ হয়েছে, `ওরা কি দেখে না, উট কিভাবে সৃজিত হলো? আকাশ কিভাবে উন্নীত হলো? পাহাড় কেমনে প্রোথিত হলো? আর জমিন কিভাবে সমতল হলো? তুমি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, সুতরাং তুমি উপদেশ দিয়ে যাও। তুমি তো তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।` (সুরা আল-গাশিয়াহ : ১৭-২২)


মানুষ যখন মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে, তার ভাবনা যখন সৃষ্টির বিশালতায় বিলীন হয়ে যায়, তখন মহাসত্য তার কাছে নিরেট সত্য এবং আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখা দেয়। ইসলাম শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা চায়নি; বরং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথে যত অন্তরায় যেমন- মাদকতা, অবাধ যৌনতা, সম্পদের প্রতি সীমাহীন লোভ- সব কিছু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। মানসিকভাবে সুস্থ মানুষই মহান আল্লাহর খলিফা। মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলার অর্থ হলো, মহান আল্লাহর খিলাফতের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলা। আর এই সুস্থ মানুষ যে বিবেক লালন করে, সেটাই মহান আল্লাহর অনুশাসনের আসল চালিকাশক্তি। কারণ মুক্তবুদ্ধির অধিকারী সুস্থ বিবেক কখনো ভুল বা অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইয়েমেনে প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে মহৎ এ কাজের জন্য নির্বাচিত করলেন। মুআজকে প্রেরণের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, মুআজ তোমার কাছে মানুষের এমন অনেক বিষয় নিয়ে আসা হবে, যেগুলো সম্পর্কে তোমাকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তা তুমি কিসের ভিত্তিতে ফয়সালা করবে? মুআজ (রা.) বললেন, আল্লাহর কিতাবের আলোকে। রাসুল (সা.) আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তাতে যদি তুমি কাক্সিক্ষত বিষয়ে কোনো সমাধান খুঁজে না পাও? মুআজ বললেন, তাহলে রাসুলের সুন্নাতের আলোকে। আল্লাহর রাসুল (সা.) আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, তাতেও যদি না পাও তাহলে? মুআজ বললেন, তাহলে আমি আমার বিবেকের আলোকে সিদ্ধান্ত দেব। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কথায় সন্তুষ্ট হয়ে এভাবে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন, `সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রাসুলের প্রতিনিধিকে এমন বোধ দান করেছেন, যার প্রতি তাঁর রাসুল সন্তুষ্ট।` (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিজি)

লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

আল্লাহ অঙ্গীকার ভঙ্গকারীকে কঠিন শাস্তি দেবেন
                                  

অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা মুমিনের অন্যতম গুণ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ প্রসঙ্গে অনেক গুরুত্ব বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। অবশ্যই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)
অন্যত্র মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১)
আরও ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণ করো।’ (আল-আনআম, আয়াত: ১৫২)
অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘(বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরা এমন) যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২০)
মহান আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণ করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯১)।

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হারাম ও মুনাফেকি
মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে ইমান নেই। অনুরূপ যে ব্যক্তি অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার মধ্যে দ্বীন নেই।’ (বায়হাকি, মিশকাত, পৃষ্ঠা : ১৫)
তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে চারটি। চতুর্থটি হলো যখন বিবাদ করে, গালাগাল করে।’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত, ১৭ পৃষ্ঠা)
হাদিসের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, অঙ্গীকার পূরণের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক আছে। যার ঈমানের ঘাটতি রয়েছে, সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। আর এর ফলে আল্লাহ তাআলা শত্রুদের তাদের ওপর প্রবল ও শক্তিশালী করে দেন।

আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে বাদী হবেন...
হাদিসে কুদসিতে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি বিচার দিবসে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো। ১. যে ব্যক্তি অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে, ২. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে এবং ৩. যে ব্যক্তি কোনো কর্মচারী নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না’ (সহিহ বুখারি)।

অঙ্গীকার ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহ
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো নেতার আনুগত্যের অঙ্গীকার করে, তার উচিত সাধ্যমতো তার আনুগত্য করা (মুসলিম)। তাই কাউকে বৈধ কোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি দিলে বা অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

যেভাবে কাজা নামাজ আদায় করতে হয়
                                  

 ভুলবশত, অপারগ হয়ে কিংবা অতি বিশেষ কারণে কোনো ওয়াক্তের নামাজ আদায় করতে না পারলে পরবর্তী সময়ে এই নামাজ আদায় করে দিতে হয়। আর এই নামাজ আদায়কে কাজা নামাজ বলা হয়। ফরজ কিংবা ওয়াজিব নামাজ ছুটে গেলে, সে নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক। সুন্নত কিংবা নফল নামাজ আদায় করা না গেলে, সেটার কাজা আদায় করতে হয় না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন করেন, ‘নামাজ মুমিনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩) তাই কোনো ওজর ব্যতীত নামাজ সময় থেকে দেরি করা জায়েজ নেই। (বুখারি, হাদিস: ৪৯৬)

  •  কোনো ওজর বা অপারগতার কারণে নামাজ সময়মতো আদায় করতে না পারলে ওই অপারগতা শেষ হওয়ার পর ওই নামাজের কাজা আদায় করা ফরজ। (বুখারি, হাদিস : ৫৬২)
  •  ফরজের কাজা ফরজ। আর ওয়াজিবের কাজা ওয়াজিব। (বুখারি, হাদিস : ১৮১৬)
  •  সুন্নত আর নফলের কাজা করবে না। তবে সুন্নত বা নফল নামাজ আরম্ভ করার পর ভেঙে গেলে তা কাজা করা আবশ্যক। (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩৩; তিরমিজি, হাদিস : ৬৬৭)
  •  যদি ফজরের সুন্নত ফজরের ফরজসহ কাজা হয়ে যায়, তবে সূর্য ঢলে যাওয়ার আগে আগে ফরজের সঙ্গে সুন্নতও কাজা করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৭৫)
  •  যদি কাজা নামাজ বেশি হয় তখন কাজা পড়ার সময় প্রতিটি নামাজকে পৃথকভাবে কাজা করতে হবে। যদি নির্ধারণ করা কষ্টসাধ্য হয়, তবে এভাবে নিয়ত করবে যে- আগে ছুটে যাওয়া জোহরের নামাজ পড়ছি বা পরে ছুটে যাওয়া জোহর বা আসর পড়ছি। (বুখারি, হাদিস : ১) আল্লাহ তাআলা আমাদের ঠিক সময়ে নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করুন।

 

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে সুস্থ থাকা সম্ভব : মার্কিন গবেষণা
                                  

নামাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিংহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। পরে তারা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলে বলেছেন, এটা প্রমাণ করেছে যে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মাধ্যমে মানুষ স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও উপকৃত হতে পারে এবং শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে।

গবেষকরা বলেছেন, নামাজের সময় শারীরিক যে ক্রিয়া হয়ে থাকে এটা যদি নিয়মিতভাবে ও নির্ধারিত সময়ে হয় তবে অন্য সব চিকিত্সা থেকে পিঠের ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা পালন করবে এই নামাজ। শারীরিক এই উপকার ছাড়াও নামাজ আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বৃদ্ধি করে। আর এই সম্পর্ক মানুষের আত্মাকে প্রশান্ত করে। নিয়মিত নামাজ শরীরের ওপর এই ঝিম প্রভাব, রক্তচাপ এবং হূদস্পন্দন কমাতে পারে, পরিণামে পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে। বিংহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, যদি কেউ ঠিক মতো রুকু করতে পারে তাহলে তার পিঠে কোনো ব্যথা থাকবে না। কেননা রুকুর সময়ই পিঠ সমান হয়ে থাকে।

এই গবেষণায় মূলত নামাজ পড়লে শারীরিক যে উপকারগুলো হবে সেই বিষয়গুলোকেই বড়ো করে তুলে ধরা হয়েছে। রুকু : নিচের পিঠ, উরু এবং ঘাড়ের পেশিগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রসারিত করে। রক্ত শরীরের ওপরের অংশে প্রবাহিত হয়। সিজদা : সিজদা দিলে হাঁড়ের জোড়ার নমনীয়তা বাড়ে। মাথা নামানোর সময় মস্তিকে রক্ত সঞ্চালন হলে রক্তচাপও কমে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। সিজদার পুনরাবৃত্তি : এই সিজদা শরীরের ভারসাম্য এনে দেয়।

তবে এটা সত্য যে নামাজ শারীরিক উপকারের জন্য পড়তে হয় না। নামাজ পড়তে হয় মহান আল্লাহর আদেশ পালন করার জন্য। তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের জন্য।

যেমন ছিল মহানবী (সা.)-এর মেহমানদারি
                                  

 অতিথিপরায়ণতার আদর্শ ছিলেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। অতিথিদের সামনে তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল। যেকোনো মেহমানকেই জানাতেন তিনি সাদর আমন্ত্রণ ও উষ্ণ অভ্যর্থনা। ধর্ম-বর্ণ ও শত্রু-মিত্রের ফারাক তিনি করতেন না। অতিথিদের কাছ থেকে কোনো অসৌজন্যতা প্রকাশ পেলেও ধৈর্য ধরতেন। আদর-আপ্যায়নের যেন কোনো ত্রুটি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতেন। বিদায়বেলায় মেহমানের হাতে তুলে দিতেন উপহার-উপঢৌকন। তার আন্তরিক আতিথেয়তায় অতিথিরা মুগ্ধ-বিস্মিত হতো। সেই মুগ্ধতা অনেক মেহমানকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে।

আতিথেয়তার ফজিলত
আতিথেয়তার ফজিলত বর্ণনা করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন তার মেহমানের সমাদর করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৯)
সালমান ফারসি (রা.) বলেন, ‘একবার আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে এলাম। একটি বালিশে হেলান দিয়ে তিনি বসা ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি বালিশটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।’ বললেন, ‘সালমান, যখন কোনো মুসলমান তার ভাইয়ের কাছে আসে তখন তার সম্মানে যদি একটি বালিশও সে এগিয়ে দেয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (হায়াতুস সাহাবা, পৃষ্ঠা : ৪৪৬)

সর্বজনীন আতিথেয়তা
রাসুল (সা.)-এর আতিথেয়তায় শর্তের কোনো বেড়াজাল ছিল না। ধনী-দরিদ্রের তফাত ছিল না। মুসলিম-অমুসলিমের তারতম্য ছিল না। শত্রু-মিত্রের কোনো ফারাক ছিল না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে অলিমায় শুধু ধনীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং গরিবদের বাদ দেওয়া হয়, তা সবচেয়ে নিকৃষ্ট খাবার।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৭৯৯)
সাহাবি রুশদ ইবনে আবদুর রহমান বলেন, ‘ইসলাম গ্রহণের আগে আমি রাসুল (সা.)-এর মেহমান হয়েছিলাম। তিনি আমার খোঁজখবর নিলেন। তার কাছে আমাকে বসালেন। যতক্ষণ আমি তার কাছে ছিলাম ততক্ষণ তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। তার এই অসাধারণ আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।’ (হায়াতুস সাহাবা, পৃষ্ঠা : ৪৪৭)

শত্রু যখন অতিথি
আরবের মুহারিব গোত্র খুবই উগ্র ছিল। কট্টর ইসলামবিরোধী ছিল। ইসলামের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে যখন মানুষ দলে দলে মদিনায় আসতে লাগল তখন মুহারিব গোত্রেরও ১০ জন লোক মদিনায় এলো। রাসুল (সা.) তাদের অভ্যর্থনা-আপ্যায়নের জন্য বেলাল (রা.)-কে দায়িত্ব দেন। সকাল-বিকাল তাদের আহারের সুব্যবস্থা করেন। এতে তারা মুগ্ধ-বিস্মিত হলো এবং ইসলাম গ্রহণ করে নিজ দেশে ফিরে গেল। (আসাহহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা : ৪৪৪)

অতিথির অসৌজন্যতায় ধৈর্যধারণ
অতিথিদের নানা দুর্ব্যবহারে তিনি সহনশীলতার পরিচয় দিতেন। তাদের অসৌজন্যতা নীরবে সয়ে যেতেন। ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিতেন তাদের। একটু কটুবাক্যও তিনি কখনো বলতেন না। অন্যদেরও কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। এক গ্রাম্য লোক নবী (সা.)-এর কাছে এলো। হঠাৎ সে মসজিদ-ই-নববীর ভেতরেই প্রস্রাব করতে লাগল। সাহাবায়ে কেরাম তাকে বাধা দিতে গেলে রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। তোমরা কঠোর হওয়ার জন্য নয়, বরং ন¤্র ব্যবহারের জন্য প্রেরিত হয়েছ।’ (বুখারি, হাদিস : ২২০)

মেহমানের খাতির-যত্ন ও আদর-আপ্যায়ন
অতিথির আদর-আপ্যায়ন ও খাতির-যতেœ রাসুলের কোনো সংকোচবোধ ছিল না। তিনি মেহমানের সঙ্গে একই পাত্রে বসে খেতেন। মেহমান তৃপ্তিসহকারে খেয়ে না ওঠা পর্যন্ত তিনি উঠতেন না। বসে থাকতেন। ভালো খাবারগুলো মেহমানের দিকে এগিয়ে দিতেন। নিজের পরিবারকে অভুক্ত রেখে তিনি মেহমানদের খাওয়াতেন।
আসহাবুস সুফফা ছিলেন রাসুল (সা.)-এর নিত্য মেহমান। তিনি তাদের খাতির-যতেœর কোনো কমতি রাখেননি। অন্য মেহমানদের তিনি আসহাবুস সুফফার সঙ্গে মসজিদ-ই-নববীতে থাকার ব্যবস্থা করতেন। তা ছাড়া দুই নারী সাহাবি রামলা ও উম্মে শরিক (রা.)-এর ঘরেও মেহমানদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। (শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ, খ- : ৪, পৃষ্ঠা : ৮০)
এতেও সংকুলান না হলে তিনি সাহাবাদের মধ্যে মেহমানদের বণ্টন করে দিতেন। তাদের খাতির-যতেœর তাগিদ দিতেন। সাহাবারাও তাদের সমাদর করতেন।
মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় অতিথির কোনো অভাব ছিল না। রাসুল (সা.) নিজেই তাদের খেদমত আঞ্জাম দিতেন। আর সাহাবি বিলাল (রা.)-কে রাষ্ট্রীয় মেহমানদের বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। (সীরাতুন নবী, খ- : ২, পৃষ্ঠা : ৫০৪)

বিদায়কালে উপহার দেওয়া
বিদায়কালে রাসুল (সা.) মেহমানদের পথখরচ ও উপহার দিতেন। কখনো পর্যাপ্ত উপহার দিতে না পারলে অল্প হলেও দিতেন এবং মেহমানের কাছে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করতেন। কখনো বিশেষ সাহাবিকে বলে দিতেন, যাতে তিনি তাদের পথখরচ দিয়ে দেন। অন্যান্য উপহার তো থাকতই। বিশেষত যখন কেউ তাঁর কাছে উপহার নিয়ে আসত তখন তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং তাকে বিদায়কালে নিজের পক্ষ থেকে অবশ্যই উপহার দিতেন। হারিস ইবনে আউফের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল রাসুলের মেহমান হলো। বিদায়কালে রাসুল (সা.) তাদের প্রত্যেককে ১০ উকিয়া পরিমাণ রুপা দিলেন। সাহাবি হারিসকে দিলেন ১২ উকিয়া পরিমাণ। (আসাহহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা : ৪৪৩)
প্রিয় নবী (সা.)-এর আতিথেয়তা মুসলমানদের অনুপম আদর্শ। আধুনিক যুগেও এসব সুন্নাহই আভিজাত্যের নিদর্শন। এসব সুন্নাহ থেকে মুসলমানরা নিত্য দূরে সরে যাচ্ছে। তাই আসুন, মেহমানের সমাদর করি। তাদের খাতির-যত্ন ও আদর-আপ্যায়নে সুন্নতের অনুসরণ করি। ইসলামের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিই পৃথিবীময়।

 

যে সময়ে নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ
                                  

নামাজ প্রাপ্ত বয়স্ক ও মানসিকভাবে সুস্থ প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। যেকোনো অবস্থায় নামাজ পড়তে হয়। অসুস্থ হলে শোয়া অবস্থায় নামাজ আদায়ের সুযোগ রেখেছে ইসলাম। তবে অনেক সময় নামাজ কিছু মুহূর্তের জন্য ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরন রয়েছে।

সেগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ-
♦ অবশ্যই নামাজ শরিয়ত সমর্থিত কোনো অপারগতা ছাড়া আদায়কারীর জন্য নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ নেই। (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩৩)
♦ আপন মা-বাবা ডেকে থাকলে, নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ আছে। (বুখারি, হাদিস: ৪/৪০৪)
♦ নামাজ আদায়কারী নামাজে থাকাকালীন যদি লক্ষ্য করেন, কোনো অন্ধ কূপ অথবা কোনো গর্তের যাচ্ছে এবং কূপে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৫)
♦ নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি যদি কাউকে চুরি করতে দেখেন, তখন নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। তবে চুরির জিনিস নূন্যতম এক দিরহাম সমপরিমাণ মূল্যের হতে হবে। জিনিসটি নামাজ আদায়কারী অথবা অন্য কারো হলেও নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। (বুখারি, হাদিস : ৪/৪১২)
♦ কেউ ব্যক্তি নামাজ আদায় করছেন, এমন অবস্থায় যদি কোনো নির্যাতিত ব্যক্তি নামাজ আদায়কারীর প্রতি সাহায্যের আবেদন করে আওয়াজ করেন; আর নামাজ আদায়কারী যদি মনে করেন তাকে জুলুম-অত্যাচার থেকে বাঁচাতে পারবেন, তখন নামাজ ভেঙে দেওয়া আবশ্যক। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৫)
♦ সফররত ব্যক্তি যদি চোরের ভয়ে শঙ্কিত হন, তবে নামাজ বিলম্ব করা জায়েজ। (বুখারি, হাদিস : ৫৬৩)
♦ অনুরূপভাবে ফিকাহবিদরা বলেন, সফররত ব্যক্তি নামাজে থাকাকালীন যদি যানবাহন ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন নামাজ ভেঙে দিতে পারবেন।


   Page 1 of 41
     ইসলামী জগত
জুমার দিনের আদব-শিষ্টাচার
.............................................................................................
কানটার জবাব দিবেন একাধিক মসজিদের আযান শুনলে?
.............................................................................................
জীবদ্দশায় বা মরণোত্তর দেহ-অঙ্গ দান প্রসঙ্গে ইসলাম যা বলে
.............................................................................................
অত্যাচারীদের পরিণাম যেমন হবে
.............................................................................................
সুখী ও ভালোবাসাময় দাম্পত্য জীবনের কিছু পাথেয়
.............................................................................................
দ্রুত বিয়ে করতে কার্যকরী ৭ আমল
.............................................................................................
পাখিদের প্রতি নবীজীর ভালোবাসা
.............................................................................................
মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলে রনি দাসের ইসলাম গ্রহণ
.............................................................................................
মসজিদ আবাদ হোক শিশুদের অংশগ্রহণে
.............................................................................................
কোরআন শরিফের কপি বেশ পুরোনো হলে যা করতে হবে
.............................................................................................
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলাম
.............................................................................................
আল্লাহ অঙ্গীকার ভঙ্গকারীকে কঠিন শাস্তি দেবেন
.............................................................................................
যেভাবে কাজা নামাজ আদায় করতে হয়
.............................................................................................
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে সুস্থ থাকা সম্ভব : মার্কিন গবেষণা
.............................................................................................
যেমন ছিল মহানবী (সা.)-এর মেহমানদারি
.............................................................................................
যে সময়ে নামাজ ভেঙে দেওয়া জায়েজ
.............................................................................................
১০ নভেম্বর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)
.............................................................................................
শিশু নির্যাতন রোধে ইসলামের নির্দেশনা
.............................................................................................
যে সাতটি অভ্যাস মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে
.............................................................................................
আজানের সময় করণীয় ও বর্জনীয়
.............................................................................................
ছোটমনিদের জন্য ইসলামিক আলোচনা
.............................................................................................
শিক্ষার্থীরা স্বস্তি পাবে ‘র‌্যাগিং প্রথা’ বন্ধ হলে
.............................................................................................
‘নিজের মন্দকাজ যদি তোমাকে পীড়া দেয়, তবেই তুমি মুমিন’
.............................................................................................
শিক্ষকের মর্যাদা দানে ইসলামের উৎসাহ
.............................................................................................
আল্লাহ শাস্তি দেবেন অবৈধভাবে পণ্যের মূল্য বাড়ালে
.............................................................................................
মহানবী (সা.)-এর উম্মত নয় বড়দের অসম্মানকারী
.............................................................................................
গাছের পাতার মতো গুনাহ ঝরে যে আমলে
.............................................................................................
জুয়া-বাজি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম
.............................................................................................
আমাকে অপরাধ-জীবন থেকে ইসলাম রক্ষা করেছে
.............................................................................................
নফল নামাজ পড়া যখন মাকরুহ
.............................................................................................
গিবত করা যায় যেসব মানুষের
.............................................................................................
যে পাঁচটি ভুল জুমার দিনে কাম্য নয়
.............................................................................................
নামাজে ‘সিজদায়ে সাহু’ দেওয়ার নিয়ম
.............................................................................................
মুসলিমদের ঐক্য জরুরি বিশ্বশান্তির জন্য
.............................................................................................
মুসলমানরা সাহায্য চাইবে একমাত্র আল্লাহর কাছে, কোন পরাশক্তির কাছে নয়
.............................................................................................
আরবি মাসগুলোর নামের অর্থ ও নামকরণের কারণ
.............................................................................................
গুনাহ মুছে দেয় ‘তাহিয়্যাতুল অজু’র নামাজ
.............................................................................................
সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ্
.............................................................................................
আকিকা কী ও তার হুকুম কী?
.............................................................................................
হজের পর হাজিদের করণীয়
.............................................................................................
শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিতে বিবাদ নিষ্পত্তি
.............................................................................................
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা আজ
.............................................................................................
আরাফার দিবসে করণীয় আমল
.............................................................................................
জুমু‘আর দিনের বিধান
.............................................................................................
দৈনন্দিন কাজে সুন্নাতের চর্চা
.............................................................................................
সাদাকার সওয়াব কি শুধু ধনীরাই পাবে?
.............................................................................................
জাহেলী যুগে কৃতকর্মের পরিণাম
.............................................................................................
যে বিষয়ে হজযাত্রীদের জানা জরুরি
.............................................................................................
বড় ইবাদত পড়াশোনা ও অধ্যয়ন
.............................................................................................
স্বামী-স্ত্রীর জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
স্বাধীন বাংলা ডট কম
মো. খয়রুল ইসলাম চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত ।

প্রধান উপদেষ্টা: ফিরোজ আহমেদ (সাবেক সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: ডাঃ মো: হারুনুর রশীদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: খায়রুজ্জামান
বার্তা সম্পাদক: মো: শরিফুল ইসলাম রানা
সহ: সম্পাদক: জুবায়ের আহমদ
বিশেষ প্রতিনিধি : মো: আকরাম খাঁন
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি: জুবের আহমদ
যোগাযোগ করুন: swadhinbangla24@gmail.com
    2015 @ All Right Reserved By swadhinbangla.com

Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]