| বাংলার জন্য ক্লিক করুন
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
রাজনীতির হঠাৎ হাওয়ার চমক

সংবাদমাধ্যমের খ্যাতি আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে অঘটন-ঘটন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে, অথবা তেমন পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে। কারণ জনমত তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের অসাধারণ ভূমিকার কথা সবারই জানা। ইদানীং বাংলাদেশে, বিশেষত রাজধানী ঢাকায় আলোচনার প্রধান বিষয়ই দাঁড়িয়েছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দাবি ও বিতর্ক।
সে নির্বাচনের প্রক্রিয়া তথা পদ্ধতিগত দিক নিয়ে এবং সেই সঙ্গে সরকারবিরোধী দলগুলোর ঐক্যমঞ্চ নিয়ে যে বিতর্ক হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলছিল, তা হঠাৎ করেই মহানগর নাট্যমঞ্চের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে যেন নাটকীয় রূপ পেয়ে গেল।
এ ঐক্যপ্রক্রিয়ার বিষয়টিও বেশ চমকপ্রদ। কিছুদিন ধরে চলছিল ড. কামাল হোসেন বনাম ডা. বি চৌধুরীর মধ্যে মতভেদ, কিছুটা মনোমালিন্য, তাও আবার ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে। সে দ্বন্দ্ব মিটে যাওয়ার পর তাঁদের ঐক্যজোট বনাম বিএনপির বোঝাপড়ার সমস্যা। সুবুদ্ধির উদয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের মধ্যে। তাঁরা ডা. চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে অতীত আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সব ঝঞ্ঝাট আপাতদৃষ্টিতে মিটিয়ে ফেলেন।
এর পরই জন্ম নিল সরকারবিরোধী ঐক্যপ্রক্রিয়া, যা তাদের ভাষায় ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’ পূর্বোক্ত শনিবারের (২২-৯-২০১৮) সমাবেশ অন্তে তাদের যাত্রা শুরু। আর তাই নিয়ে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা সংবাদমাধ্যমে সহসা চমক লাগানো সংবাদ পরিবেশনÑমোটা মোটা হরফে প্রথম পাতায় শীর্ষ শিরোনামে, বলতে হয় একযোগে প্রধান জনপ্রিয় দৈনিকগুলোতে।
ঘটনা একটু অভাবিতই ঠেকেছে। তাই শুরুতে সংবাদমাধ্যমের শক্তি ও খ্যাতির কথা মনে এলো। কারণ এরইমধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বোক্ত প্রক্রিয়াটি মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, ছিল কাঁটা বিছানো পথে হাঁটার মতো ঘটনা। সেসবের শেষ হতে না হতে মূলত বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’কে বিশেষ গুরুত্বে প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম।
মনে হয় তারা এর মধ্যে বিশেষ সম্ভাবনার ঝলকানি দেখতে পেয়েছে, তাই একটি দৈনিকে মোটা শিরোনাম ‘গণজাগরণের ডাক’। সচিত্র এ প্রতিবেদনে শীর্ষ বক্তব্য : ‘ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় একমঞ্চে সরকারবিরোধীরা’। একই সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মূল বক্তব্য তথা স্লোগান : ‘স্বাধীনতাপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’ (বি চৌধুরী)।
প্রশ্ন উঠতে পারে স্বাধীনতাপক্ষের শক্তি বলতে এ ক্ষেত্রে কাদের বোঝানো হয়েছে? সমাবেশে উপস্থিত দলগুলোকে? এতদিন পর্যন্ত আমরা শুনে এসেছি, দেখে এসেছি বিভিন্ন মঞ্চে, বিভিন্ন প্রসঙ্গের বিবৃতিতে বা ঘোষণায় আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজদের এবং তাদের সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে চিহ্নিত করে এসেছে, এখনো তাই।
এ দাবি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ পেলেও অস্বীকার করা যায়নি যে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের রাজনৈতিক পরিচালনায় প্রধান শক্তি ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলো। যেমনÑসিপিবি ও অন্য কোনো কোনো দল। অন্যদিকে বামপন্থীদের বড়সড় অংশ পৃথকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রাম চালিয়েছে, কেউ কেউ একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে।
তা সত্ত্বেও একাত্তরের যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে নিয়ে সম্মিলিত জাতীয় সরকার গঠন করা হয়নি। সত্তরের নির্বাচনী ফলাফলের নিরিখে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, যদিও সত্তরের নির্বাচন ছিল ছয় দফার ভিত্তিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ড. কামাল হোসেন বরাবরই নমনীয় তথা রাজনৈতিক ভাষ্যে নরমপন্থী। তিনি চড়া সুরে কথা বলেন না। তাই এবারও তাঁর বক্তব্য, ‘মানুষ চায় দেশে সুশাসন নিশ্চিত হোক।’ এটা অবশ্য সবারই চাওয়া, বিরাজমান সামাজিক-নৈরাজ্যের পটভূমিতে। বিএনপির পক্ষে স্বভাবতই মূল স্লোগান ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের, তাদের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে। আ স ম আবদুর রবের (একাত্তরের চার ছাত্রনেতার অন্যতম) ‘মানচিত্র লুট হওয়ার শঙ্কা’ প্রকাশ বলা বাহুল্য ভিন্ন মাত্রার।
অন্য স্বনামখ্যাত দৈনিকগুলোতে এ প্রসঙ্গে সংবাদ শিরোনাম হিসাব-নিকাশ করেÑযেমন ‘ঐক্যের আনুষ্ঠানিক যাত্রা’, অন্যদিকে ‘নিরপেক্ষ সরকার চায় ঐক্যপ্রক্রিয়া’ এবং ‘সরকারকে আলোচনার আলটিমেটাম’ ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এই নির্বাচনী ঐক্যের মূল দাবি ভোট পরিচালনায় ক্ষমতাসীন সরকার-নিরপেক্ষ সরকার অর্থাৎ সেই পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যে দাবির বিরুদ্ধে অনড় আওয়ামী লীগ।

দুই.
সংবাদপত্রের পরিবেশনা যেমনই হোক, তাদেরই পরিবেশিত ভিন্ন ভিন্ন সূত্রের খবর জোড়া দিতে গেলে দেখা যায় এই ঐক্যে অদৃশ্য চিড়, মতামতের ভিন্নতা, বক্তব্যের স্ববিরোধিতা ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে দমননীতির মুখে বিধ্বস্ত বিএনপির পক্ষে এই ঐক্যজোট গড়ার কোনো বিকল্প ছিল না। এটা তাদের অস্তিত্ব-সংকট সমাধানের লড়াই, পূর্ব ভুলের মাসুল গোনা।
হয়তো তাই বিএনপির প্রবাসী নেতা তারেক রহমানের বোধোদয় ঘটেছে। বিতাড়িত ডা. বি চৌধুরীর নেতৃত্ব মেনে নিতে দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, এমনকি পরামর্শ একদা আওয়ামী লীগ ত্যাগী, গণফোরামপ্রধান ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বও মেনে নিতে। কারণ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতি মামলায় কারাগারে। বিএনপির ঐক্য গড়ার হিসাব-নিকাশ অনেকটা এ রকমই।
তবু বিশদ বিশ্লেষণে এ ঐক্যজোটের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধিতার দিকগুলো মোটামুটি স্পষ্ট। এ জোটের অন্যতম নেতা, বিএনপি আমলের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বি চৌধুরী বলেছেন : ‘যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল এবং আছেÑতাদের সঙ্গে ঐক্য করব না’ (২৩-৯-২০১৮)। স্বভাবতই প্রশ্ন : বিএনপি-জামায়াত গাঁটছড়া তো এখনো অটুট, তাহলে তাদের সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন কিভাবে সম্ভব হলো। দ্বিতীয়ত, ড. কামাল হোসেনের রাজনীতির হাতেখড়ি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। তিনি মূলত একজন মননশীল, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী, রাজনীতি তখন বাধ্যতামূলকভাবে তাঁর কাঁধে চেপেছে, যেমন আরো অনেকের। এরপর আর রাজনীতির প্রাঙ্গণ থেকে সরে আসা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর পায়ের নিচে রাজনীতির মাটি কখনো শক্ত হয়নি।
আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয় রাজনৈতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, এমনকি সম্ভাবনাময় গণফোরামের প্রধান হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরও। তবে তিনি নিজেকে বরাবরই স্বাধীনতার পক্ষের রাজনীতিক রূপে গণ্য করেছেন, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও তাই। বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামের ঘাতক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে থাকেন তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতিতে। এখন তিনিই বা কিভাবে হাত মেলাচ্ছেন জামায়াতসঙ্গী বিএনপির সঙ্গে?
প্রশ্নগুলোর জবাব রাজনীতি সচেতন মানুষ জানতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য প্রচলিত প্রবাদ, রাজনীতিতে মিল-অমিল, ঐক্য-অনৈক্য নিয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কিন্তু এই যদি হয় রাজনীতির আদর্শ, তাহলে সে রাজনীতি কি কখনো জনস্বার্থ পূরণ করতে পারে, ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ, এককথায় কায়েমি স্বার্থ উপেক্ষা করে? তা ছাড়া দ্বিধাবিভক্ত ভারতীয় রাজনীতি কি কথিত স্বাধীনতা-উত্তরকালে সা¤্রাজ্যবাদী স্বার্থবলয়ের বাইরে সক্রিয় থাকতে পেরেছে, বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্যবাদের বাইরে? এ ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা কতখানি, কেমন?
এ জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই অনেকেরই প্রশ্ন, প্রশ্ন জোট ও দল বিশেষের নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে এবং প্রশ্ন রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তি বা বিশ্লেষকদের, দেশের স্বার্থ বিবেচনায়। এ প্রসঙ্গে একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেÑ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া জাতীয় চরিত্রের হয় কিভাবে দেশের প্রধান দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে?’ আমাদের দেশে সমাজ-রাজনীতির একটি প্রবণতা সব কিছুতেই ‘জাতীয়’ শব্দটির তকমা ব্যবহার করা। ঐক্যপ্রক্রিয়াও তাই করেছে।

তিন.
রাজনৈতিক অঙ্গনে নবজোটের যাত্রা, নীতিগত ঘোষণা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া! বিশেষ করে যখন ঐক্যজোটের ঘোষণা : অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ সংগঠনের। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কি এযাবৎ বিএনপিবিষয়ক নীতিই অনুসরণ করে চলবে? মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি কিন্তু বিরোধীদের পক্ষে সহূদয়।
এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট নয়, যা অচিরে বোঝা যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এ কথা ঠিক যে এ জোটের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী শিবিরে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। একটি পত্রিকার ভাষ্যমতে, ‘আওয়ামী লীগে আতঙ্ক’। এর যুক্তিসম্মত প্রেক্ষাপট একটিইÑদীর্ঘকাল শাসনক্ষমতায় থেকে জনস্বার্থ পূরণ করতে না পারার জন-অসন্তোষ, যে বিষয়টির চরিত্র সর্বজনীন তথা বিশ্বজনীন।
আমার বিশ্বাস, আওয়ামী লীগে অস্বস্তি বা আতঙ্ক যদি থাকেও, তা যতটা বাস্তবে ঐক্যজোটের কারণে, তার চেয়ে বেশি তাদের সুশাসনের ঘাটতি, সামাজিক নৈরাজ্য এবং চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, গুম খুনের প্রবলতা, সর্বোপরি ব্যাপক দুর্নীতি, যা বহু কথিত। অন্যদিকে দলের উচ্চাভিলাষীদের সৃষ্ট অনৈক্য, সেই সঙ্গে দলে অন্তঃকলহ, নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্রোহী প্রার্থী গ্রুপ তৈরির আশঙ্কা ইত্যাদি।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগের শঙ্কা বা আতঙ্কের কারণ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই নিহিত। সেটাই তাদের সংকট। আর এ সমস্যা-সংকটের সুযোগ নিতে চেষ্টা করবে সম্প্রতি গঠিত বিএনপি ঐক্যজোট। আওয়ামী লীগের সতর্কতার জায়গাটি এখানে, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে এমনটিই প্রতীয়মান।

লেখক :
আহমদ রফিক

কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

রাজনীতির হঠাৎ হাওয়ার চমক
                                  

সংবাদমাধ্যমের খ্যাতি আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে অঘটন-ঘটন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে, অথবা তেমন পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে। কারণ জনমত তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের অসাধারণ ভূমিকার কথা সবারই জানা। ইদানীং বাংলাদেশে, বিশেষত রাজধানী ঢাকায় আলোচনার প্রধান বিষয়ই দাঁড়িয়েছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দাবি ও বিতর্ক।
সে নির্বাচনের প্রক্রিয়া তথা পদ্ধতিগত দিক নিয়ে এবং সেই সঙ্গে সরকারবিরোধী দলগুলোর ঐক্যমঞ্চ নিয়ে যে বিতর্ক হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলছিল, তা হঠাৎ করেই মহানগর নাট্যমঞ্চের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে যেন নাটকীয় রূপ পেয়ে গেল।
এ ঐক্যপ্রক্রিয়ার বিষয়টিও বেশ চমকপ্রদ। কিছুদিন ধরে চলছিল ড. কামাল হোসেন বনাম ডা. বি চৌধুরীর মধ্যে মতভেদ, কিছুটা মনোমালিন্য, তাও আবার ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে। সে দ্বন্দ্ব মিটে যাওয়ার পর তাঁদের ঐক্যজোট বনাম বিএনপির বোঝাপড়ার সমস্যা। সুবুদ্ধির উদয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের মধ্যে। তাঁরা ডা. চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে অতীত আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সব ঝঞ্ঝাট আপাতদৃষ্টিতে মিটিয়ে ফেলেন।
এর পরই জন্ম নিল সরকারবিরোধী ঐক্যপ্রক্রিয়া, যা তাদের ভাষায় ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’ পূর্বোক্ত শনিবারের (২২-৯-২০১৮) সমাবেশ অন্তে তাদের যাত্রা শুরু। আর তাই নিয়ে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা সংবাদমাধ্যমে সহসা চমক লাগানো সংবাদ পরিবেশনÑমোটা মোটা হরফে প্রথম পাতায় শীর্ষ শিরোনামে, বলতে হয় একযোগে প্রধান জনপ্রিয় দৈনিকগুলোতে।
ঘটনা একটু অভাবিতই ঠেকেছে। তাই শুরুতে সংবাদমাধ্যমের শক্তি ও খ্যাতির কথা মনে এলো। কারণ এরইমধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বোক্ত প্রক্রিয়াটি মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, ছিল কাঁটা বিছানো পথে হাঁটার মতো ঘটনা। সেসবের শেষ হতে না হতে মূলত বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’কে বিশেষ গুরুত্বে প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম।
মনে হয় তারা এর মধ্যে বিশেষ সম্ভাবনার ঝলকানি দেখতে পেয়েছে, তাই একটি দৈনিকে মোটা শিরোনাম ‘গণজাগরণের ডাক’। সচিত্র এ প্রতিবেদনে শীর্ষ বক্তব্য : ‘ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় একমঞ্চে সরকারবিরোধীরা’। একই সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মূল বক্তব্য তথা স্লোগান : ‘স্বাধীনতাপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’ (বি চৌধুরী)।
প্রশ্ন উঠতে পারে স্বাধীনতাপক্ষের শক্তি বলতে এ ক্ষেত্রে কাদের বোঝানো হয়েছে? সমাবেশে উপস্থিত দলগুলোকে? এতদিন পর্যন্ত আমরা শুনে এসেছি, দেখে এসেছি বিভিন্ন মঞ্চে, বিভিন্ন প্রসঙ্গের বিবৃতিতে বা ঘোষণায় আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজদের এবং তাদের সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে চিহ্নিত করে এসেছে, এখনো তাই।
এ দাবি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ পেলেও অস্বীকার করা যায়নি যে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের রাজনৈতিক পরিচালনায় প্রধান শক্তি ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলো। যেমনÑসিপিবি ও অন্য কোনো কোনো দল। অন্যদিকে বামপন্থীদের বড়সড় অংশ পৃথকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রাম চালিয়েছে, কেউ কেউ একই সঙ্গে দুই ফ্রন্টে।
তা সত্ত্বেও একাত্তরের যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে নিয়ে সম্মিলিত জাতীয় সরকার গঠন করা হয়নি। সত্তরের নির্বাচনী ফলাফলের নিরিখে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, যদিও সত্তরের নির্বাচন ছিল ছয় দফার ভিত্তিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ড. কামাল হোসেন বরাবরই নমনীয় তথা রাজনৈতিক ভাষ্যে নরমপন্থী। তিনি চড়া সুরে কথা বলেন না। তাই এবারও তাঁর বক্তব্য, ‘মানুষ চায় দেশে সুশাসন নিশ্চিত হোক।’ এটা অবশ্য সবারই চাওয়া, বিরাজমান সামাজিক-নৈরাজ্যের পটভূমিতে। বিএনপির পক্ষে স্বভাবতই মূল স্লোগান ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের, তাদের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে। আ স ম আবদুর রবের (একাত্তরের চার ছাত্রনেতার অন্যতম) ‘মানচিত্র লুট হওয়ার শঙ্কা’ প্রকাশ বলা বাহুল্য ভিন্ন মাত্রার।
অন্য স্বনামখ্যাত দৈনিকগুলোতে এ প্রসঙ্গে সংবাদ শিরোনাম হিসাব-নিকাশ করেÑযেমন ‘ঐক্যের আনুষ্ঠানিক যাত্রা’, অন্যদিকে ‘নিরপেক্ষ সরকার চায় ঐক্যপ্রক্রিয়া’ এবং ‘সরকারকে আলোচনার আলটিমেটাম’ ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এই নির্বাচনী ঐক্যের মূল দাবি ভোট পরিচালনায় ক্ষমতাসীন সরকার-নিরপেক্ষ সরকার অর্থাৎ সেই পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যে দাবির বিরুদ্ধে অনড় আওয়ামী লীগ।

দুই.
সংবাদপত্রের পরিবেশনা যেমনই হোক, তাদেরই পরিবেশিত ভিন্ন ভিন্ন সূত্রের খবর জোড়া দিতে গেলে দেখা যায় এই ঐক্যে অদৃশ্য চিড়, মতামতের ভিন্নতা, বক্তব্যের স্ববিরোধিতা ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে দমননীতির মুখে বিধ্বস্ত বিএনপির পক্ষে এই ঐক্যজোট গড়ার কোনো বিকল্প ছিল না। এটা তাদের অস্তিত্ব-সংকট সমাধানের লড়াই, পূর্ব ভুলের মাসুল গোনা।
হয়তো তাই বিএনপির প্রবাসী নেতা তারেক রহমানের বোধোদয় ঘটেছে। বিতাড়িত ডা. বি চৌধুরীর নেতৃত্ব মেনে নিতে দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, এমনকি পরামর্শ একদা আওয়ামী লীগ ত্যাগী, গণফোরামপ্রধান ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বও মেনে নিতে। কারণ দলের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতি মামলায় কারাগারে। বিএনপির ঐক্য গড়ার হিসাব-নিকাশ অনেকটা এ রকমই।
তবু বিশদ বিশ্লেষণে এ ঐক্যজোটের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধিতার দিকগুলো মোটামুটি স্পষ্ট। এ জোটের অন্যতম নেতা, বিএনপি আমলের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বি চৌধুরী বলেছেন : ‘যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল এবং আছেÑতাদের সঙ্গে ঐক্য করব না’ (২৩-৯-২০১৮)। স্বভাবতই প্রশ্ন : বিএনপি-জামায়াত গাঁটছড়া তো এখনো অটুট, তাহলে তাদের সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন কিভাবে সম্ভব হলো। দ্বিতীয়ত, ড. কামাল হোসেনের রাজনীতির হাতেখড়ি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। তিনি মূলত একজন মননশীল, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী, রাজনীতি তখন বাধ্যতামূলকভাবে তাঁর কাঁধে চেপেছে, যেমন আরো অনেকের। এরপর আর রাজনীতির প্রাঙ্গণ থেকে সরে আসা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাঁর পায়ের নিচে রাজনীতির মাটি কখনো শক্ত হয়নি।
আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয় রাজনৈতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, এমনকি সম্ভাবনাময় গণফোরামের প্রধান হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরও। তবে তিনি নিজেকে বরাবরই স্বাধীনতার পক্ষের রাজনীতিক রূপে গণ্য করেছেন, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও তাই। বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামের ঘাতক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে থাকেন তাঁর বক্তৃতা-বিবৃতিতে। এখন তিনিই বা কিভাবে হাত মেলাচ্ছেন জামায়াতসঙ্গী বিএনপির সঙ্গে?
প্রশ্নগুলোর জবাব রাজনীতি সচেতন মানুষ জানতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য প্রচলিত প্রবাদ, রাজনীতিতে মিল-অমিল, ঐক্য-অনৈক্য নিয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কিন্তু এই যদি হয় রাজনীতির আদর্শ, তাহলে সে রাজনীতি কি কখনো জনস্বার্থ পূরণ করতে পারে, ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ, এককথায় কায়েমি স্বার্থ উপেক্ষা করে? তা ছাড়া দ্বিধাবিভক্ত ভারতীয় রাজনীতি কি কথিত স্বাধীনতা-উত্তরকালে সা¤্রাজ্যবাদী স্বার্থবলয়ের বাইরে সক্রিয় থাকতে পেরেছে, বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্যবাদের বাইরে? এ ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা কতখানি, কেমন?
এ জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই অনেকেরই প্রশ্ন, প্রশ্ন জোট ও দল বিশেষের নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে এবং প্রশ্ন রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তি বা বিশ্লেষকদের, দেশের স্বার্থ বিবেচনায়। এ প্রসঙ্গে একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেÑ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া জাতীয় চরিত্রের হয় কিভাবে দেশের প্রধান দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে?’ আমাদের দেশে সমাজ-রাজনীতির একটি প্রবণতা সব কিছুতেই ‘জাতীয়’ শব্দটির তকমা ব্যবহার করা। ঐক্যপ্রক্রিয়াও তাই করেছে।

তিন.
রাজনৈতিক অঙ্গনে নবজোটের যাত্রা, নীতিগত ঘোষণা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া! বিশেষ করে যখন ঐক্যজোটের ঘোষণা : অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ সংগঠনের। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কি এযাবৎ বিএনপিবিষয়ক নীতিই অনুসরণ করে চলবে? মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি কিন্তু বিরোধীদের পক্ষে সহূদয়।
এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট নয়, যা অচিরে বোঝা যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এ কথা ঠিক যে এ জোটের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী শিবিরে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। একটি পত্রিকার ভাষ্যমতে, ‘আওয়ামী লীগে আতঙ্ক’। এর যুক্তিসম্মত প্রেক্ষাপট একটিইÑদীর্ঘকাল শাসনক্ষমতায় থেকে জনস্বার্থ পূরণ করতে না পারার জন-অসন্তোষ, যে বিষয়টির চরিত্র সর্বজনীন তথা বিশ্বজনীন।
আমার বিশ্বাস, আওয়ামী লীগে অস্বস্তি বা আতঙ্ক যদি থাকেও, তা যতটা বাস্তবে ঐক্যজোটের কারণে, তার চেয়ে বেশি তাদের সুশাসনের ঘাটতি, সামাজিক নৈরাজ্য এবং চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, গুম খুনের প্রবলতা, সর্বোপরি ব্যাপক দুর্নীতি, যা বহু কথিত। অন্যদিকে দলের উচ্চাভিলাষীদের সৃষ্ট অনৈক্য, সেই সঙ্গে দলে অন্তঃকলহ, নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্রোহী প্রার্থী গ্রুপ তৈরির আশঙ্কা ইত্যাদি।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগের শঙ্কা বা আতঙ্কের কারণ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই নিহিত। সেটাই তাদের সংকট। আর এ সমস্যা-সংকটের সুযোগ নিতে চেষ্টা করবে সম্প্রতি গঠিত বিএনপি ঐক্যজোট। আওয়ামী লীগের সতর্কতার জায়গাটি এখানে, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে এমনটিই প্রতীয়মান।

লেখক :
আহমদ রফিক

কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে
                                  

সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অতি ধনীর সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে। ‘ওয়েলথ এক্স’-এর রিপোর্টে তাদেরই অতি ধনী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ডলার বা তার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় যাদের সম্পদ ২৫০ কোটি টাকার বেশি, তারাই ‘অতি ধনী’ বলে গণ্য হবেন। অতি ধনী মানুষের দেশ বলে যে ১০টি দেশ তালিকার শীর্ষে আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সংবাদের শিরোনাম হয়েছে এ কারণে যে, এখানে অতি ধনীর সংখ্যা পৃথিবীর মধ্যে দ্রুত হারে (১৭.৩ শতাংশ) বাড়ছে।
অতি ধনী মূলত কারা হচ্ছেন এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হলে দেখা যাবে, যারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি আছেন তারাই দ্রুত ধনী হচ্ছে। ক্ষমতাই ‘অর্থ’। তাই সবাই অর্থের লোভে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়। আগে যারা রাজনীতি করতেন, তাদের মধ্যে অর্থের লালসা খুব একটা ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশেই আজ ব্যবসায়ী রাজনীতিকের ভিড়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসার চেয়ে আজ রাজনীতি বেশি পছন্দ করেন। কেন একজন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী তার ব্যবসায় মনোযোগ না দিয়ে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তা একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এর পেছনে রয়েছে টাকা আয়ের গোপন অভিলাষ।
রাজনীতি হলো একটি দেশের চালিকাশক্তি। একটি দেশকে নির্মাণ করা এবং সেই দেশের মানুষকে সার্বিক নিরাপত্তা দেয়া রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্তমান বিশ্বে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা বা তত্ত্ব রাজনীতিকে আরো বেশি সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান করে তুলেছে। কল্যাণরাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার পূরণ করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। এ কর্তব্যকে কিছুতেই রাষ্ট্র অস্বীকার করতে পারে না। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনীতি দুটোই এখন আমজনতার সেবা দিতে বাধ্য। কেননা জনতা যদি রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে অনাস্থা প্রকাশ করে, তাহলে অবস্থা কতটা ভয়াবহ হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সারা পৃথিবীর মতো আমাদের বাংলাদেশেও রাজনীতিতে বর্তমানে ব্যবসায়ী অনুপ্রবেশ প্রবণতা সাংঘাতিক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত। এ অশনিসংকেত বুঝেও যদি আমরা না বোঝার ভান করি, তাহলে আমাদের তৈরি বিপদ আমাদেরই গ্রাস করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা অনেক বেশি দৃশ্যমান। ব্যবসায়ীরা যেভাবে রাজনীতিতে বেনোজলের মতো ঢুকে পড়ছেন, তাতে দেশের সৎ, যোগ্য ও মেধাবী রাজনীতিবিদরা তো কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেনই, সঙ্গে সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষও বঞ্চিত হচ্ছে যথার্থ সেবা থেকে। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতি একসময় মুখ থুবড়ে পড়বে। অরাজকতা সৃষ্টি হবে রাজনীতির অঙ্গনে, যা আমাদের জন্য মোটেই শুভ হবে না। প্লেটো তার ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার অধিকার রাখেননি। কারণ তিনি জানতেন, যার যে কাজ তার সে কাজ করাই উচিত। ব্যবসায়ীরা যেখানে হাত দেন, সেখান থেকেই তারা টাকা উপার্জন করার কথা ভাবেন। তারা হাসপাতাল তৈরি করেন টাকার জন্য, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় করেন টাকার জন্য, পত্রিকার মালিকানা বলি আর টিভি চ্যানেলের মালিকানা, সবখানেই আছে টাকা বানানোর মনোবৃত্তি। টাকা কামানোর এত এত পথ থাকতে রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য কী? ডিউটি ফ্রি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি, কম দামে প্লট, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিনা পুঁজিতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামানোর জন্য? আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে টাকা লগ্নি করতেন কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করতেন না, আজকের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন দলের জন্য টাকা ব্যয় না করে নিজেই নেমে পড়ছেন রাজনীতিতে। ফলে বদলে যাচ্ছে রাজনীতির ব্যাকরণ। টাটা, বিড়লা, বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েও রাজনীতিতে পা রাখেননি, ব্যবসার দিকে মনোযোগী হওয়াই তাদের প্রধান কাজ ছিল। ব্যবসায়ই তারা সফলতা পেয়েছিলেন। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদেরও অনুরোধ করবÑ রাজনীতিকে টাকা বানানোর যন্ত্র না বানিয়ে নিজের ব্যবসায় মন দিন। তাতে দেশের অর্থনীতি সবল হবে, প্রকৃত রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন। যারা আমাদের প্রবীণ রাজনীতিক বা রাজনৈতিক কর্মী, তারা জানেন ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারে যারা মন্ত্রিসভার সভ্য ছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ, উকিল ও ডাক্তার। যেমনÑ খয়রাত হোসেন, শেখ মুজিবুর রহমান, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আতাউর রহমান খান, শরৎ চন্দ্র মজুমদার, মাহমুদ আলী, হাসিম উদ্দিন আহমদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর, মসিউর রহমান প্রমুখ। অধ্যাপকরাও সে সময়ের রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ছিলেন। অতীতে রাজনীতির অঙ্গনে আমরা সেই মানুষগুলোকেই দেখেছি, যারা দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। আজ যারা ব্যবসায়ী নেতা, যারা টাকার জোরে রাজনীতির মঞ্চে এসে প্রবেশ করেছেন, তাদের কাছে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা সবকিছুই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। টাকাওয়ালা ব্যবসায়ীরা টাকা ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। এরা রাজনীতিকে টাকা কামানোর অন্যতম শক্তিশালী উৎস বলেই মনে করেন। বঙ্গবন্ধুর সময়েও এ প্রবণতা আমরা দেখিনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিকে এদিকে ঠেলে দেন। তিনি বলেন, ‘ও ংযধষষ সধশব ঢ়ড়ষরঃরপং ফরভরপঁষঃ ভড়ৎ ঢ়ড়ষরঃরপরধহং.’ তিনি আরো বলেন, ‘গড়হবু রং হড় ঢ়ৎড়নষবস.’ এই যে জিয়ার ‘রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তোলা’ এবং ‘টাকা কোনো সমস্যা নয়’ বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে হিং¯্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। আমরা দেখি বিএনপি গঠন করার জন্য জিয়াউর রহমান দেশ রক্ষার মহান কাজে নিয়োজিত সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেন এবং কতিপয় সেনা কর্মকর্তাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। তিনি এমন এমন ব্যক্তিকে রাজনীতির মাঠে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন, যারা দেশের চিহ্নিত অপরাধী ও অবৈধ টাকার মালিক। তাছাড়া দেশদ্রোহী রাজাকারদের জিয়াই প্রথম রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। ফলে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর আসেন আরেক জেনারেল হোসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও জিয়ার মতো জাতীয় পার্টি গঠন করেন সেনা সদস্য, অস্ত্র ও টাকার ওপর ভিত্তি করে। ছাত্রদের হাতে অর্থ ও অস্ত্র তুলে দিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে হত্যার জন্য জিয়া ও এরশাদের কুটিল ভূমিকা চিরদিন বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ মনে রাখবে। এরশাদের জাতীয় পার্টিতেও একে একে এসে যোগ দেন সুযোগসন্ধানী আমলা, সেনা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। এরশাদের পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে সেই নতুন সরকারের মধ্যেও দেখা যায় ব্যবসায়ী নেতা, সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে শুধু ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাই নন, সেখানে ধীরে ধীরে জঙ্গিরাও অনুপ্রবেশ করে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল। সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলের কাছে দেশের সাধারণ মানুষ গঠনমূলক রাজনীতি প্রত্যাশা করে। কিন্তু আওয়ামী লীগও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেও এখন ব্যবসায়ী নেতাদের আনাগোনা একেবারে কম নয়। যেহেতু সব দলেই এখন ব্যবসায়ীদের জয়জয়কার এবং টাকা ছাড়া যেহেতু নির্বাচনে জয়লাভ করা বর্তমান সময়ে কঠিন, তাই আওয়ামী লীগও অন্যান্য দলের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এ ছাড়া যে আর কোনো উপায় নেই! যদি আমরা বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে একটু ভালো করে তাকাই তাহলে দেখব, তৃণমূল পর্যায় থেকেই শুরু হয়েছে রাজনীতিতে টাকাওয়ালা বা ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ। যার টাকা আছে তার পেছনেই লোক আছে, যেকোনো জায়গায় টাকাওয়ালার জন্য চেয়ার আছে। ফলে টাকা ইনভেস্ট করতে টাকাওয়ালারা মোটেই দ্বিধা করেন না। আজকের দিনে সমাজে একজন সৎ মানুষের চেয়ে টাকাওয়ালা মানুষের দাম বেশি। যেহেতু টাকার দাম বেশি, তাই টাকা যাদের আছে তারাই তো সমাজপতি হবেন। আগে জ্ঞানীরা সমাজপতি হতেন, এখন ধনীরা সমাজপতি হন। এ চিন্তাচেতনা ভ্রান্ত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে সমাজ কিছুদিন পরেই নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে। পৃথিবীতে রাজনীতি কোনো সহজ কাজ নয়। যেকোনো লোকের পক্ষেই রাজনীতি করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। ব্যবসায়ীরাই যদি রাজনীতি করতে পারতেন, তাহলে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, এ জে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানরা রাজনীতি করে মানুষের এত কাছে যেতে পারতেন না, জনগণকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিতে পারতেন না।
ব্যবসায়ীদের কাজ হলো মুনাফা করা, মানুষের দাবিদাওয়া পূরণ করা নয়। তাদের কাছে মানুষের চেয়ে টাকার দাম বেশি। পক্ষান্তরে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের কাছে টাকার চেয়ে মানুষের দাম বেশি। দুটি বিপরীত বিশ্বাস নিয়ে দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে আছেন প্রকৃত রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদরা। আমরা যদি এখনই রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদের পার্থক্য বুঝতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে দুঃখ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে আসুন আজ থেকেই প্রকৃত রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি তুলে দিই। বিদায় জানাই ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাদের। রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের হাত থেকে বাঁচাতে হলে জনতার সচেতনতা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কেননা জনতাই পারে রাজনীতি না-জানা টাকাওয়ালা ব্যবসায়ীদের রাজনীতির ব্যাকরণ শিক্ষা দিতে।


লেখক:মোনায়েম সরকার রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট

 

 

ওজোনস্তরের নতুন দুঃসংবাদ
                                  

গত শতকের শেষের দিকে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ওপরে ওজোনস্তরে বিশাল এক গহ্বর তৈরির দুঃসংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৬ মে ১৯৮৫ সালে প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল ‘নেচার’ সেই দুঃসংবাদ প্রকাশ করার পর টনক নড়ে উঠেছিল বিশ্বের সংশ্লিষ্ট মহলের। ত্বরান্বিত হয়েছিল ওজোনস্তর রক্ষার জন্য ঐতিহাসিক মন্ট্রিয়ল চুক্তি। আর এই চুক্তির ফলে ওজোনস্তর ক্ষয়কারী ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) তৈরি, নিয়ন্ত্রণ কিংবা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। ফলে অ্যান্টার্কটিকার উপরিস্থিত ওজোনস্তরে বিশাল গহ্বরের আয়তন কমে আসছিল। নাসা ও জাতিসংঘ থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে আগামি কয়েক দশকের মধ্যেই উল্লিখিত গহ্বরের আয়তন তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে এসে তা ক্ষতিকর পর্যায়ের নিচে চলে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ৩৩ বছর পরে ১৬ মে ২০১৮ ওজোনস্তর সম্পর্কিত নতুন দুঃসংবাদ আবার সেই ‘নেচারে’ প্রকাশিত হয়েছে। ড. মনাস্কাসহ মোট ১৭ জন বিজ্ঞানীর লেখা সেই প্রবন্ধে বলা হয়েছেÑ১. ওজোনস্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যগুলো তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সিএফসি-১১ উৎপাদনের পরিমাণ সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২০ বছর আগে যে পরিমাণ সিএফসি-১১ নিঃসরণ হতো আজও সেই পরিমাণ সিএফসি-১১ নিঃসরণ হচ্ছে। অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণও হ্রাস পায়নি। ২. এই গ্যাস নিঃসরণের জন্য নির্দিষ্টভাবে কোনো দেশকে চিহ্নিত করা না গেলেও পূর্ব এশিয়া থেকে তা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ৩. গবেষণার এই ফলাফল নতুনভাবে সিএফসি গ্যাস তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের সিএফসি গ্যাস তৈরি বন্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বেমানান। উল্লেখ্য, সাড়া জাগানো এই প্রবন্ধের লেখকরা মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্যানেলের সদস্য। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা কাজ করেন।
এই প্রবন্ধ প্রকাশের আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইউরোপিয়ান জিওসায়েন্স ইউনিয়নের একটি জার্নালে (অ্যাটমসফেরিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিজিকস) প্রকাশিত প্রবন্ধেও ওজোনস্তর সম্পর্কে দুঃসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। এই প্রবন্ধটিও ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ জন বিজ্ঞানীর যৌথভাবে লেখা। এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রবন্ধটির একজন লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজ, লন্ডনের প্রফেসর ড. হেগ নিউ ইয়র্কভিত্তিক ‘সায়েন্স ফ্রাইডে’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বিষুবরেখার কাছে ও মধ্য অক্ষাংশের ভেতরে ওজোনস্তরের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয়।’ ১৯৯৮ সাল থেকেই মেরু অঞ্চলের বাইরেও বিষুবরেখার ৬০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলজুড়ে ওজোনস্তরের নিচের দিক ক্রমাগতভাবে পাতলা হচ্ছে বলে সেই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। গবেষণাপত্রে যদিও ওজোন কলামের গড় দৈর্ঘ্য তাৎপর্যপূর্ণভাবে এখনো না কমার কথা বলা হয়েছে, তবু এই ফলাফল নিঃসন্দেহে নতুন আরেক দুঃসংবাদ। এতদিন পর্যন্ত ওজোনস্তর ক্ষয়ের সংবাদ মূলত অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ওপরেই সীমাবদ্ধ ছিল। গবেষণার ফলাফল সত্যি হলে সুমেরুবৃত্তের দক্ষিণে বাংলাদেশসহ প্রায় গোটা উত্তর গোলার্ধে ও অ্যান্টার্কটিকা ছাড়াও গোটা দক্ষিণ গোলার্ধে ভবিষ্যতে ওজোনস্তর ক্ষয়জনিত অভিঘাত দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ড. মনাস্কাদের গবেষণা ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রবন্ধটি প্রকাশের দিনেই অর্থাৎ ১৬ মে ২০১৮ বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চলতি শতকের মাঝামাঝি প্রত্যাশামাফিক ওজোনস্তর যখন ঠিক হওয়ার পথে তখন ক্রমবর্ধমান সিএফসি-১১ নিঃসরণ ওজোনস্তর ঠিক হওয়ার পথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্যানেলের সদস্যÑযাঁরা আবার এই প্রবন্ধের লেখক, তাঁরা এ বছরের মধ্যে চুক্তির চতুর্থ বার্ষিক মূল্যায়ন করবেন।
জাতিসংঘের ওজোন সেক্রেটারিয়েট ২৬ জুলাই ২০১৮ একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে ২০১২ থেকে সিএফসি-১১ নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়া, পূর্ব এশিয়া থেকে এই গ্যাস নিঃসরণ হওয়া ও ২০১০ সাল থেকে বন্ধ হওয়া সিএফসি-১১ অগোচরীভূত অবস্থায় আবার তৈরি হওয়ার বিষয়ে ‘নেচার’ প্রকাশিত ফলাফলের সঙ্গে একমত হয়ে এগুলো মন্ট্রিয়ল প্রটোকলভুক্ত দেশগুলোর আসন্ন ৩০তম সভায় (৫-৯ নভেম্বর ২০১৮, ইকুয়েডর) উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সিএফসি-১১ নিঃসরণের নির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিতকরণের বিষয়টিও বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ওজোনস্তরের এ রকম দুঃসংবাদ-উত্তর পরিস্থিতির মধ্যে এবারের আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর রক্ষা দিবস ২০১৮ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের এই দিবসের ইংরেজি প্রতিপাদ্যের (কিপ কুল অ্যান্ড ক্যারি অন) বাংলা ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘বিশ্বকে ঠা-া রাখো ও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।’ আসলে ওজোনস্তর ক্ষয়কারী অনেক রাসায়নিক বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্যও দায়ী। কাজেই ওজোনস্তর রক্ষার কর্মকা- বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের ব্যাপারেও সাহায্য করবে। এ ছাড়া ‘সিএফসি’ ও ‘এইচসিএফসি’র বিকল্প হিসেবে শিল্প-কারখানায় বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘এইচএফসি’ (হাইড্রোফ্লুরোকার্বন) ওজোনস্তরের জন্য ক্ষতিকারক না হলেও তা কার্বন ডাই-অক্সাইডের থেকে প্রায় হাজার গুণ শক্তিশালী ও অনেক বেশি বৈশ্বিক উষ্ণতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। বলা হচ্ছে যে এইচএফসি কমাতে পারলে বিশ্বের তাপমাত্রা ০.৫ ডিগ্রি কমে আসবে। আর সে কারণেই এবারের আন্তর্জাতিক ওজোন দিবসের প্রতিপাদ্যে ওজোনস্তর রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয় সম্পর্কেও সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এবারের এই দিবসে সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা প্রয়োজন যে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে ওজোনস্তর তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর যা কিছু করি না কেন, তা গোপন থাকবে না। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরে কোনো দেশ সেই চুক্তির শর্ত না মানলে তাকে অবশ্যই অন্যায় হিসেবে দেখা হবে। মন্ট্রিয়ল প্রটোকলভুক্ত ১৯৭টি দেশের আসন্ন ৩০তম সভায় নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আলোচনা হবে। ওজোনস্তর ধ্বংসকারী বস্তুর উৎপাদন উৎস নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতকরণ ও সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তও প্রত্যাশা করা যায়।
বাংলাদেশ ওজোনস্তর রক্ষায় ভিয়েনা কনভেনশন, মন্ট্রিয়ল প্রটোকল ও এ পর্যন্ত চারটি সংশোধনীতে (লন্ডন, কোপেনহেগেন, মন্ট্রিয়ল ও বেইজিং) স্বাক্ষর করেছে। তবে ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি সম্মেলনে মন্ট্রিয়ল প্রটোকলে তালিকাভুক্ত রাসায়নিকের সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক হাইড্রোফ্লুরোকার্বনকে (এইচএফসি) সংযুক্ত করে তৈরি করা ‘কিগালি সংশোধনী’তে এখনো স্বাক্ষর করেনি। জানা গেছে সে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।
ওজোনস্তর রক্ষায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত জাতীয় ওজোন ইউনিট গঠন, ওজোনস্তর ক্ষয়কারী বস্তুর উৎপাদন, ব্যবহার, আমদানি ও রপ্তানি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন ও সংশোধনসহ অনেক কাজেই সন্তোষজনক সাফল্য লাভ করেছে। প্রযুক্তিগত কিছু প্রশিক্ষণ কাজও সম্পন্ন হয়েছে। বহুপক্ষীয় তহবিল থেকে বাংলাদেশ ১১.৭৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার অনুমোদন পেয়েছে, তবে বাংলাদেশের জন্য এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এইচএফসি প্রতিস্থাপন। বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটর, এয়ারকুলার, (ভবন বা মার্কেটে সেন্ট্রাল সিস্টেমসহ) গাড়ি ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে বিপুল পরিমাণ এইচএফসি ব্যবহৃত হয়েছে ও হচ্ছে। বিশেষ করে আমদানীকৃত গাড়ি ও ইনহেলারে এইচএফসি প্রতিস্থাপন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া এইচএফসির বিকল্প যে ডজনখানেক রাসায়নিক বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে তার প্রতিটি কমবেশি দাহ্য। এ ধরনের দাহ্য রাসায়নিক ব্যবহার উপযোগী করার জন্য যে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের নেই। সেটিও আরেকটি চ্যালেঞ্জ। মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। আশা করা যায়, এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশ সময়মতো সঠিকভাবে মোকাবেলা করে ওজোনস্তর রক্ষা ও বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরবে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীন ওজোন ইউনিটের কাছে একটি অনুরোধ থাকবে যে ওজোনস্তর রক্ষাসংক্রান্ত বাংলাদেশে সমাপ্তকৃত, চলমান এবং ভবিষ্যৎ কর্মকা- সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য ও পরিসংখ্যানসহ (ওজোনস্তর রক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রধান কর্মকা-ের লিংকসহ) একটি ওয়েবসাইট চালু করা।

লেখক : 
বিধান চন্দ্র দাস অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞান গবেষণা ও বাংলাদেশ
                                  

গত সপ্তাহটি আমার জন্য খুবই আনন্দের একটি সপ্তাহ ছিল। এক সপ্তাহে বাংলাদেশের ল্যাবরেটরিতে করা তিনটি সফল গবেষণার খবর দেশের মানুষ জানতে পেরেছে। প্রথমটি অবশ্য আমি আগে থেকেই জানি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত বিশেষ একটি প্রক্রিয়া ক্যান্সার রোগীদের রক্তে প্রয়োগ করে সেখানে আলাদা এক ধরনের সংকেত পাওয়া। অন্য দুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। দুই জায়গাতেই ইলিশ মাছের জিনোম বের করা হয়েছে। আমাদের ইলিশ মাছের জিনোম যদি আমরা বের না করি, তাহলে কে বের করবে?
আমার মনে আছে, ২০১০ সালে আমার প্রিয় একজন মানুষ মাকসুদুল আলম পাটের জিনোম বের করেছিলেন। আমরা আগেই খবর পেয়েছি, পরের দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এর ঘোষণা দেবেন। কিন্তু আমাদের দেশের খবরের কাগজগুলো কি খবরটি ঠিক করে ছাপাবে? আমার মনে আছে, এর আগের দিন আমরা দেশের সব খবরের কাগজের সম্পাদকদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বলেছি, ‘আগামীকাল সংসদে বিজ্ঞানের অনেক বড় একটি খবর ঘোষণা করা হবে। আপনারা প্লিজ, খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় খবরটি বড় করে ছাপাবেন।’ খবরের কাগজগুলো আমাদের অনুরোধ রেখেছিল, সব খবরের কাগজ বড় বড় করে খবরটি ছাপিয়েছিল। দেশের বাইরে থেকে দেশে গবেষণার জন্য মাকসুদুল আলম অনেক চেষ্টা করতেন; হঠাৎ করে সবাইকে ছেড়ে একদিন চলে গেলেন।
আমাদের দেশের অনেকের ধারণা, এ দেশে বুঝি বিজ্ঞানের বড় গবেষণা হতে পারে না। সে জন্য জুট জিনোমের খবরটি আমরা অনেক বড় করে সবাইকে জানাতে চেয়েছিলাম। গত সপ্তাহে একইভাবে তিনটি বড় গবেষণার খবর এসেছে। যারা নিজের দেশের বিজ্ঞানীদের ওপর বিশ্বাস রাখে না তারা নিশ্চয়ই এবার নতুন করে ভাববে। আমি যতটুকু জানি, আরো কিছুদিনের ভেতর পেটেন্টের আরো কিছু খবর আসবে। পেটেন্টের জন্য আবেদন করার আগে যেহেতু কোনো তথ্য জানাতে হয় না, তাই আমরা এ মুহূর্তে সেই গবেষণাগুলোর খবর সম্পর্কে এখনো কিছু জানতে পারছি না।
পেটেন্টের বিষয়টি সবাই ঠিকভাবে জানে কি না, আমার জানা নেই। এটি হচ্ছে আবিষ্কারের স্বত্ব রক্ষা করার পদ্ধতি। পৃথিবীর যেকোনো মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, রেডিও কে আবিষ্কার করেছে? সেই মানুষটি মার্কোনির নাম বলবে। আমিও ছোটবেলায় তাঁর নাম মুখস্থ করে এসেছি। অথচ বিজ্ঞানজগতের ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, আমাদের বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু রেডিও প্রযুক্তির খুঁটিনাটি মার্কোনির সমসাময়িককালে আবিষ্কার করেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু কিছুতেই তাঁর আবিষ্কার পেটেন্ট করতে রাজি হননি (এ ব্যাপারে তাঁর একটি চমৎকার চিঠি আছে। তিনি কতটা নির্লোভ মানুষ এবং জ্ঞানের ব্যাপারে কতটা উদার, সে চিঠি পড়লে বোঝা যায়)। মার্কোনি তাঁর উল্টো। প্রথম সুযোগে তিনি তাঁর কাজ পেটেন্ট করে ফেলেছিলেন। সে জন্য সারা পৃথিবী রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে মার্কোনির নাম জানে, জগদীশচন্দ্র বসুর কথা কেউ জানে না (তবে অতি সাম্প্রতিককালে জগদীশচন্দ্র বসুকে ইতিহাসে তাঁর যোগ্য স্থান দেওয়ার জন্য অনেক কাজ শুরু হয়েছে)।
পেটেন্ট করা হয় একটি আবিষ্কারের স্বত্বকে রক্ষা করার জন্য। কাজেই পেটেন্টটি কোন দেশে করা হচ্ছে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট সম্পর্কে আমার অল্প কিছু ধারণা আছে। আমি যখন বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যোগ দিই, একেবারে প্রথম দিনেই সেই ল্যাবরেটরি আমার সব মেধাস্বত্ব এক ডলার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিনে নিয়েছিল। হ্যাঁ, লিখতে ভুল হয়নি; পরিমাণটা এক ডলার। আমাকে দেওয়ার জন্য তারা নতুন ঝকঝকে একটি এক ডলারের নোট নিয়ে এসেছিল।
বেল কমিউনিকেশনস ল্যাবরেটরিতে থাকার সময় আমরা যে বিষয় নিয়ে কাজ করেছি, সেগুলো নিয়ে গোটা তিনেক পেটেন্ট হয়েছে। তবে তার কোনোটিরই মেধাস্বত্ব আমার নিজের না, ল্যাবরেটরি প্রথম দিনই এক ডলার দিয়ে কিনে রেখেছে! মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রে পেটেন্ট করতে অনেক টাকা লাগে। পরিমাণটা ১০০ হাজার ডলারও হতে পারে! যার আবিষ্কার পেটেন্ট হয়েছে, সে চাইলে তাকে খুব সুন্দর করে ফ্রেম করে পেটেন্টের একটি কপি তৈরি করে দেয়, তার বেশি কিছু নয়!
তবে পেটেন্ট নিয়ে আমার একটি মজার স্মৃতি আছে। আমি যখন বেল কমিউনিকেশনস ল্যাবরেটরিতে ফাইবার অপটিক সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি তখন ইতালি থেকে একজন বিজ্ঞানী আমার সঙ্গে কাজ করতে এসেছেন। আমি একটি এক্সপেরিমেন্ট করছি। এক্সপেরিমেন্টটি ঠিক করে করার জন্য আমি সেখানে দুটি অপটিক্যাল আইসোলেটর নামে ডিভাইস লাগিয়েছি। ইতালির বিজ্ঞানী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ওই দুটি কেন লাগিয়েছ?’ আমি তাঁকে কারণটি ব্যাখ্যা করে বললাম, আমাদের এক্সপেরিমেন্টে এগুলো সব সময় ব্যবহার করতে হয়।
ইতালির বিজ্ঞানীর চোখ চকচক করে উঠল! তিনি বললেন, ‘বিষয়টি পেটেন্ট করে ফেলি!’ আমি অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তিনি নতুন এসেছেন বলে জানেন না, আমরা যারা এ ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে আসছি তারা জানি বিষয়টি একটি কমন সেন্স ছাড়া কিছু না।
আমি বললাম, “তুমি এটি পেটেন্ট করতে চাও? এটি হচ্ছে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’র মতো একটি কমন সেন্স। কেউ কখনো ১০০ হাজার ডলার খরচ করে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’কে পেটেন্ট করে?”
ইতালীয় বিজ্ঞানী পিরেলি নামে অনেক বড় একটি কম্পানি থেকে এসেছেন। তাঁদের টাকার অভাব নেই। তিনি আমার কথায় বিচলিত হলেন না, আমাকে জানালেন, তিনি আসলেই এটি পেটেন্ট করে ফেলবেন!
বলাই বাহুল্য, আমি তাঁর ছেলেমানুষি কাজকর্ম দেখে খুবই হতাশ! তাঁকে বললাম, ‘তোমার যা ইচ্ছে হয় করো! আমি এর মধ্যে নেই।’
বিজ্ঞানী মানুষটি শেষ পর্যন্ত কী করেছেন আমি তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
এরপর কয়েক বছর কেটে গেছে। আমি দেশে চলে এসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের জীবনের সঙ্গে আর বিশেষ সম্পর্ক নেই।
তখন হঠাৎ একদিন আমি আমার সাবেক বসের কাছ থেকে একটি টেলিফোন পেলাম। বেচারা প্রায় পাগলের মতো আমাকে ফোন করেছেন। চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি জানো, এখানে কী হয়েছে?’
আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’
‘মনে আছে, তোমার সঙ্গে ইতালির একজন বিজ্ঞানী কাজ করেছিল?’
আমি বললাম, ‘মনে আছে।’
‘সে অপটিক্যাল আইসোলেটর ব্যবহার করার বিষয়টি পেটেন্ট করে ফেলেছে। এখন আমরা আর এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি না। সেই কম্পানি আমাদের কাছে লাইসেন্সিং ফি চায়!’
আমি শুনে হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারি না। আমার কাছে ব্যাপারটি অনেকটা এ রকম, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ বিষয়টি কেউ পেটেন্ট করে ফেলেছে, এখন সত্যি কথা বললেই তাকে টাকা দিতে হচ্ছে!
যা হোক, আমার বস আমাকে অনুরোধ করলেন, আমার সব ল্যাবরেটরি নোটবুক যেন ফটোকপি করে তাঁর কাছে পাঠাই। এগুলো দেখিয়ে তারা দাবি করবে, যেহেতু গবেষণার কাজে আমারও অবদান আছে, অন্তত আমাদের কাছে যেন লাইসেন্সের ফি দাবি না করে।
আমি সব কাগজপত্র পাঠিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল আমার জানা নেই।
আমাদের দেশের জন্য পেটেন্ট বিষয়টি নতুন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার যে বিষয়টির জন্য পেটেন্টের আবেদন করা হয়েছে, আমার জানামতে এটি এ দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক পেটেন্ট। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বড় কর্মকর্তার নিজের মুখে শুনেও আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে এর আগে এ দেশ থেকে পেটেন্টের আবেদন করা হয়নি। পেটেন্ট আসলে এক ধরনের সম্পদ। সব পেটেন্টই যে বড় সম্পদ তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু কোনো আবিষ্কার যদি হঠাৎ করে বড় কোনো কাজে লেগে যায় তখন সেটি অনেক বড় সম্পদ হতে পারে। নতুন পৃথিবীটিতে জ্ঞান হচ্ছে সম্পদ এবং সেই সম্পদের পরিমাপ করা হয় পেটেন্ট দিয়ে। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের যেহেতু গবেষণা করার ক্ষমতা আছে, তারা তাদের আবিষ্কারগুলো পেটেন্ট করে দেশের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করবে, সেটি তো আমরা আশা করতেই পারি। ঘটনাটি এ দেশে আগে ঘটেনি, এই প্রথমবার শুরু হলো।
বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, তা একেকজন একেকভাবে অনুভব করে। আমি সেটি অনুভব করি এ দেশে বিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়টি দিয়ে। গবেষণা কিন্তু খরচসাপেক্ষ। সব গবেষণা যে সফল হয়, তা-ও নয়। অনেক গবেষণারই ফলাফল হয় শূন্য; কিন্তু তার পরও গবেষণায় লেগে থাকতে হয়।
গবেষণার পরিমাপের সবচেয়ে নিখুঁত সূচক হচ্ছে পিএইচডি শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আমার মনে আছে, বেশ কয়েক বছর আগে আমরা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচডি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল বারো শর থেকে বেশি। অথচ আমাদের সারা দেশ মিলিয়েও সংখ্যাটি তার ধারেকাছে নয়। আমার মনে আছে, ফিরে এসে আমি পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলাম যে এক হাজার পিএইচডি চাই। আমার সেই লেখা পড়ে কেউ কেউ পিএইচডি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা লিখেছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কানাডাপ্রবাসী একজন সাবেক কূটনীতিক একজনের পিএইচডি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি চেক আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এদিক দিয়ে আমি খুবই সৌভাগ্যবান। সারাটি জীবনই আমি চমৎকার হৃদয়বান মানুষের দেখা পেয়েছি।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো মূলত আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ আমরা ছেলে-মেয়েদের পড়িয়ে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি দিই। সোজা বাংলায় জ্ঞান বিতরণ করি। শুধু জ্ঞান বিতরণ করা হলে কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না। সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে তাকে জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয়। জ্ঞান সৃষ্টি করার জন্য গবেষণা করতে হয় এবং গবেষণা করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে পিএইচডি প্রগ্রাম। কারণ পিএইচডি করার সময় শিক্ষার্থীরা টানা কয়েক বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে সময় দেয়।
একটা সময় ছিল, যখন পিএইচডি শিক্ষার্থীদের কোনো স্কলারশিপ দেওয়ার উপায় ছিল না। যদিও বা দেওয়া হতো, তার পরিমাণ এত কম ছিল যে কোনো শিক্ষার্থীর যদি নিজের আলাদা উপার্জন না থাকত, তার পক্ষে পিএইচডি গবেষণা করার কোনো উপায় ছিল না।
কয়েক বছর থেকে আমি লক্ষ করছি যে পিএইচডি গবেষণার জন্য স্কলারশিপ বাড়ছে এবং সেটি মোটামুটি একটি সম্মানজনক পরিমাণে পৌঁছে গেছে। আমার কাছে মনে হয়, দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তার একটি বড় প্রমাণ। আমরা গবেষণার জন্য টাকা খরচ করতে প্রস্তুত হয়েছি।
তবে এখনো কিছু বিষয় নিষ্পত্তি হয়নি। আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা এখনো নিজ দেশে পিএইচডি করার বিষয়টি অন্তর থেকে গ্রহণ করেনি। এ দেশের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী পিএইচডি করার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে। একবার দেশের বাইরে গেলে তাদের খুব ছোট একটি অংশ দেশে ফিরে আসছে। আমরা যদি আমাদের দেশের ল্যাবরেটরিতে সত্যিকারের গবেষণা করতে পারি, তাহলে হয়তো এই নতুন প্রজন্মকে বোঝানো সম্ভব হবে, দেশেও সত্যিকারের গবেষণা করা সম্ভব। যারা দেশ ছেড়ে গিয়ে দেশের কথা স্মরণ করে লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, তাদের কাউকে কাউকে হয়তো তখন দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। যেদিন আমরা আবিষ্কার করব, আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে গিয়ে তাদের লেখাপড়া-গবেষণা শেষ করে আবার দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছে, সেদিন বুঝতে পারব যে আমাদের দেশটি এবার সত্যি সত্যি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে শুরু করেছে। অনেক আশা নিয়ে সেই দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করে আছি।

লেখক :
মুহম্মদ জাফর ইকবাল অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চাই
                                  

বিষয়টির প্রাথমিক পর্বের সূচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উপলক্ষে গণহত্যা ও ইহুদি হত্যার বিচারের ঘটনায়। অমানবিক যত রকম নৃশংসতা সম্ভবÑযেমন চরম নির্যাতন, ব্যাপক নারী ধর্ষণ এবং জাতিগত ও গোষ্ঠীগত হত্যাÑসবই করেছিল বিশেষভাবে হিটলার-মুসোলিনি-তোজোর মতো শাসক শ্রেণির নির্দেশে তাঁদের ঘাতক বাহিনী। প্রচার সর্বাধিক হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর।
শুধু রণাঙ্গনে সৈনিক হত্যা নয়, স্বদেশে ও অধিকৃত অঞ্চলে হত্যা, নাশকতা ও নারী ধর্ষণ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিটলারের যেমন ক্রোধ ছিল প্রথমত ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর ওপর, তেমনি দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর; বিশেষত কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের ওপর। তাঁর নীতি তাদের নির্বিচার হত্যা। শেষোক্ত ঘটনাটি রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘উইচহান্টিং’ নামে পরিচিত।
ইতিহাসের পরিহাস এবং অন্যতম শক্তিমান সা¤্রাজ্যবাদী বিজয়ের কারণে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে গণহত্যার অংশ হিসেবে কমিউনিস্ট নিধনের বর্বরতা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত হয়নি। যেমন জার্মানিতে, তেমনি ইতালিতে। এবং তার শুরু যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিচারটি ছিল মূলত যুদ্ধাপরাধের, সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক গণহত্যার।
এ বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদি হত্যার প্রতিদান হিসেবে ইহুদি জাতির প্রাপ্তি ইসরায়েল রাষ্ট্র, মিত্রশক্তির সম্মিলিত সিদ্ধান্তে। কিন্তু রাজনৈতিক হত্যা আমলে আসেনি। তবে এই বিচার ও আদালত প্রতিষ্ঠার সুফল হলো ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার সুবিচারের সুযোগ। কিন্তু সে সুযোগ কি সর্বত্র বা সবার জন্য মিলেছে? জাতিসংঘ কি ততটা স্বাধীন হাত-পা খেলাতে পারে, কিংবা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত তথা আইসিসি কি ততটা আদর্শনিষ্ঠ, নিয়মনিষ্ঠ? তারা তাদেরই নিয়ম-কানুনের কতটা ধারক-বাহক?
আফ্রিকা থেকে বলকান অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি চিলি, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি ইরানে সংঘটিত গণহত্যাগুলোর মধ্যে কয়টির বিচার হয়েছে, ইতিহাস এ সম্পর্কে কী বলে তা আমাদের অজানা নয়। ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট হত্যার নামে গণহত্যার ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে লাশের বাধায় নদীর জল¯্রােত ব্যাহত হয়েছিল। তৎকালীন সংবাদপত্রে এমন তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল। চিলির ঘটনাও ভিন্ন ছিল না।
আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা? ব্রিটিশ ও মার্কিন দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোর খবরে ও হিসাবে এবং বিচারে পূর্ববঙ্গে অপারেশনরত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালি গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে লেখার সংখ্যা খুব একটা কম নয়। তবু সে গণহত্যার বিচার হয়নি আন্তর্জাতিক আদালতে। বরং দেরিতে হলেও বাংলাদেশ পাকিস্তানি সেনা অপরাধীদের বিচার করতে না পারলেও তাদের বাঙালি মূল দোসর কিছুসংখ্যকের বিচার করেছে। তাতেই আপত্তি শোনা গেছে পাকিস্তানসহ একাধিক মহলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে।

দুই.
বেশ কিছুকাল থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, পরবর্তী সময়ে কথিত গণতন্ত্রী সু চি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায়ও রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গা গণহত্যার বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে একাধিক ধারায়, তার চরিত্রও ভিন্ন কিছু নয়; যদিও সেখানে কোনো প্রকার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেনি। সুস্পষ্ট বিচারে তা ছিল ধর্মীয় জাতিসত্তা হিসেবে রোহিঙ্গাদের তাদের স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করা। সেই উচ্ছেদ উদ্দেশ্য সফল করতে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, সঙ্গে ঘাতক-সন্ত্রাসী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ক্যাডার বাহিনী।
নরহত্যার এ বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে দফায় দফায়। বেশ কয়েক বছর থেকে গণহত্যার সূচনায় যখন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে চট্টগ্রাম সীমান্তে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশ শরণার্থী বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। সেসব শরণার্থী তাই তাদের স্বদেশে ফিরে যায়নি। ফেরত পাঠানোর ততটা তাগিদ দেওয়া হয়নি; যদিও কিছু সামাজিক জটিলতা শুরু হয়েছিল।
এরপর এবারকার গণহত্যার সংখ্যাধিক্য এবং সংঘটিত ঘটনার বর্বরতার মাত্রাধিক্য যেমন বাংলাদেশকে শঙ্কিত ও সচেতন করে তোলে, তেমনি ঘটনার বর্বরতা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বিশেষ করে জাতিসংঘের। তদুপরি মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী জাতিসংঘের স্বাভাবিক কর্মকা-ে বাধা সৃষ্টি এমনকি তাদের উপদ্রুত অঞ্চলে প্রবেশে অনুমতি না দেওয়ার প্রাথমিক আচরণ জাতিসংঘকে ক্ষুব্ধ করেছে। পরিস্থিতির জটিলতা ক্রমেই বেড়েছে।
জাতিসংঘ ক্রমে বাস্তব অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে, ঘটনার চরিত্র অনুধাবন করেছে, শরণার্থীদের জবানবন্দি নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে সংঘটিত অপরাধের গুরুত্ব সম্পর্কে, যা গণহত্যার তুল্যমূল্য। বাংলাদেশ সরকারও ঘটনাবলির গুরুত্ব ও তাৎপর্য আগের তুলনায় অধিক সচেতনতায় অনুধাবন করতে পেরেছে। তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে মিয়ানমার শরণার্থীদের ফেরত নিতে মোটেই ইচ্ছুক নয়।
কথার চাতুর্যে ও ছলাকলায় সিদ্ধহস্ত মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও শাসক শ্রেণি প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে বিলম্বিত করে রাজনৈতিক হিমঘরে ফেলে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। এখন এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তারা প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইচ্ছে করেই পিছিয়ে রয়েছে; যাতে রোহিঙ্গারা প্রতিকূল পরিবেশে ফিরতে রাজি না হয়, জাতিসংঘও যাতে একই ধারায় পথ চলে।
মিয়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যে কতটা নির্মম-নিষ্ঠুর, কতটা অগণতন্ত্রী ও অমানবিক তার প্রমাণ সম্প্রতি রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের সাত বছর কারাদ-। অপরাধ? তাঁরা রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার বিষয়টি নিয়ে বাস্তব সত্য জানতে চেষ্টা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। এই অপরাধে (?) পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া ব্যাপক। শুধু রয়টার্স ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে তা-ই নয়; জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক ও বহু সংখ্যক আঞ্চলিক সংগঠন এ রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। অনুরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক রাষ্ট্র।
হতে পারে দুই সাংবাদিকের অন্যায় কারাদ-ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে হয়তো একসময় ওই সাংবাদিকদ্বয় মুক্তি পেয়েও যেতে পারেন। কিন্তু একটি বিষয় সহজ ও সরল যে মিয়ানমারের শাসকরা রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত বর্বর গণহত্যার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করার সুযোগ দেবে না।
বাংলাদেশকে বুঝতে হবে যে মিয়ানমার পর্যাপ্ত চাপে না পড়া পর্যন্ত শরণার্থী রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে আসতে দেবে না। এরইমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার ফলাফল প্রায় শূন্য। জাতিসংঘ চেষ্টা সত্ত্বেও সফল হতে পারছে না। এ অবস্থায় একমাত্র ওষুধ আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগ উপস্থাপন এবং বিচারের জন্য নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা চালানো।
কিন্তু বিষয়টি যত সহজে বলা গেল, তত সহজ নয়। এসব বিচারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে যথেষ্ট নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা, সেসব পার হয়ে বিচার শুরু করা একটি দীর্ঘস্থায়ী বিষয়। অবশ্য সংবাদপত্রগুলোতে নিজস্ব প্রতিবেদনে বা একাধিক আইনজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকের যেসব মতামত প্রকাশিত হচ্ছে তার ঘোরপ্যাঁচে না গিয়ে আমাদের সহজ-সরল বক্তব্যÑসম্ভাব্য সব পথেই যেকোনো সংশ্লিষ্ট সংস্থায় বা আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে চালাতেই হবে।
এটা একটা শ্রমসাপেক্ষ, জটিল, নিরন্তর প্রক্রিয়াÑতবু এ ক্ষেত্রে অবহেলার বা প্রয়োজনমাফিক সাড়া দেওয়ার দীর্ঘসূত্রতার কোনো অবকাশ নেই। পররাষ্ট্র ও আইন বিভাগের জন্য প্রয়োজন হবে সার্বক্ষণিক সচেতনতার। এ বিষয়ে পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য কিছুটা হলেও অনুকূল। সে সুযোগ হারানো যাবে না।
কারণ আমরা জানি, অতীত অভিজ্ঞতা বলে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান ব্যাহত হওয়ার খুবই সম্ভাবনা। চীন এ ক্ষেত্রে বিরোধিতা করতে পারে তার ভেটোদানের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। সে ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান অমীমাংসিত থেকে যাবে। তাই বিচারের পথে, আদালতে যাওয়ার পথ ধরেই চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। কূটনৈতিক তৎপরতা হতে হবে সর্বমাত্রিক। এতে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায়।
একটি বিষয় বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে যে মিয়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শুধু যে উগ্র জাতীয়তাবাদী চরিত্রের, যা ফ্যাসিবাদের তুল্য তা-ই নয়, তাদের মিথ্যাচার, তথ্য বিকৃতি, ছলনা-প্রতারণা তুলনারহিত। তাদের কথায় ও কাজে আকাশ-পাতাল প্রভেদ। তাদের সঙ্গে আচরণে বাংলাদেশকে সতর্ক পদক্ষেপে চলতে হবে, মৌখিক, এমনকি লিখিত প্রতিশ্রুতির ওপরও শতভাগ নির্ভর না করে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি কাজে পরিণত না হয়।
গত বছরের তুলনায় এ বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল নিশ্চিত হয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে। তারা এ ব্যাপারে কিছুটা তৎপরতা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যদিও তা সময়সাপেক্ষ। তারা গণহত্যার বিচার অনুষ্ঠানেও আগ্রহী। তাই বলে বাংলাদেশের আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই।
আর সে জন্যই বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে চীনা-বিরোধিতার মুখে (মিত্র দেশ ভারতও এ ব্যাপারে সমর্থক মিত্র নয়) ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই পারবে মিয়ানমারকে কোণঠাসা করতে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের হুমকির মাধ্যমে। যে কায়দায় তারা সু চিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, একই ধারায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা রাখাইনের সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক পরিস্থিতি, যা প্রত্যাবাসনের অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নতুন করে বৈনাশিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চাইবে না। আর তাদের জোর করে মৃত্যু ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়াও যাবে না। এ বিষয়ে মিয়ানমার এখনো অনড় অবস্থানে। এই স্পর্শকাতর দিকগুলোও জাতিসংঘ ও পরাশক্তির সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনতে হবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ বাস্তবিকই এখনো উভয়-সংকটে। কবে যে এ সংকট ও সমস্যার সমাধান হবে বলা কঠিন।

লেখক :
আহমদ রফিক, কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

চীনা ‘ইউয়ান’, ভারতীয় ‘রুপী’, তুর্কী ‘লিরা’ সবার দাম কমছে
                                  

পাঁচ-সাত দিনের জন্য কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিলাম। এতে বিপত্তি হয়েছে দুটো। প্রথমত বিমানের টিকেট-অসম্ভব চড়া দামে তা কিনতে হয়। কারণ একটাই। ঈদের ছুটি। অনেকেই কলকাতা যাচ্ছে। তাই চাহিদা-সরবরাহের নীতিতে টিকেটের দাম কোম্পানিগুলো যাচ্ছেতাই ভাবে বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিপত্তি প্রচ- গরম এখন কলকাতায়। তাও ভাল, কিন্তু গরমের সঙ্গে হিউমিনিটি। হাঁটা-চলার কোন উপায় নেই। এরইমধ্যে ভাল খবর পেলাম ডলার বাজারে। ভারতে এখন ডলারের দাম চড়া। প্রতিদিন তা বাড়ছে। সকালে এক দর তো বিকেলে আর এক দর। দেখলাম ৭০ রুপী, একদিন পরেই ৭০ দশমিক ২০ রুপী। আরেকদিন পরেই ৭১ রুপী। আমি তো অবাক। এটি ঘটছে। ভারতের রুপী বেশ কিছুদিন স্থিতিশীল ছিল। এখন দেখছি ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বলছেন তাদের রুপী অতি মূল্যায়িত। এর মূল্য আরও হ্রাস পাওয়া দরকার। তাহলে রফতানি বাড়বে। এই মুহূর্তে ভারতে রফতানি বাড়ছে কম। কিন্তু আমদানি অনেক বেশি। আমদানি খরচ বাড়ার মূল কারণ তেল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বাড়ছে। ভারত বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। বড় উৎস ইরান, কিন্তু ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতানৈক্য চলছে। এই সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে তাদের সঙ্গে চায়। কিন্তু ভারত এই চাপে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। এই অনিশ্চয়তারও তেলের দামের ওপর চাপা পড়েছে। অধিকন্তু তুরস্কের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয়। তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফাটাফাটি চলছে। এক খ্রীস্টান ধর্মযাজককে তুরস্ক বন্দী করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মুক্তি চায়। তুরস্ক এতে অস্বীকৃত। এদিকে তুরস্কের মুদ্রা ‘লিরা’র দামও পড়ছে। পড়ছে মানে অস্বাভাবিকভাবে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে এমন দেশগুলোর মুদ্রাতে। বলাবাহুল্য, ভারতও এর মধ্যে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে ‘এমাজিং মার্কেটের’। দেশগুলোর মুদ্রার মূল্য নিচের দিকে। ইন্দোনেশিয়ার ‘রুপীয়া’ চীনা ইউয়ান, ফিলিপিন্স পেসো, মালয়েশিয়ার ‘রিঙিট’, সিঙ্গাপুরী ডলার, থাইল্যান্ডের বাথ, রাশিয়ার রুবল, দক্ষিণ আফ্রিকার ‘র‌্যান্ড’, ব্রাজিলের রিয়েল, আর্জেন্টিার পেসো-এসব মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাব যেমন ভারতের মুদ্রায় পড়েছে তেমনি পড়েছে বাংলাদেশের টাকাতে। আমাদের টাকার মানও বহুদিন স্থিতিশীল থেকে এখন অবমূল্যায়িত হচ্ছে। খোলা বাজারে ৮৪-৮৫ টাকার ডলার বিক্রি হয়। আমাদের আমদানি খরচ যেমন বেড়েছে, ভারতেরও তাই। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমবর্ধমান, তাদেরও তাই। তেলের মূল্যের চাপ কমাতে ভারত সরকার পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়াচ্ছে এবং তা ঘনঘন। ফলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
ভারতীয় অর্থনীতিবিদরা নানা আশঙ্কা করছেন। আমাদের এই অবস্থায় একটু লাভ হওয়ার কথা। ভারতীয় রুপীর যদি দাম হ্রাস পায় তাহলে আমাদের আমদানিকারকদের সুবিধা। ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর। চীনের কাছ থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি মাল আমদানি করি। তারপরেই ভারত। ভারতের কাছ থেকে বছরে আমরা সরকারীভাবে কমপক্ষে ষাট-পয়ষট্টি হাজার কোটি টাকার মাল আমদানি করি। চীন থেকে কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার মাল আনি। এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’ এবং ভারতীয় মুদ্রা ‘রুপী’র দুটোই অবমূল্যায়িত হচ্ছে। যেমন হচ্ছে আমাদের টাকার। যদি এই অবমূল্যায়ন আমাদের পক্ষে হয় তাহলে একই পরিমাণ ডলার দিয়ে আমরা বেশি পরিমাণ ভারতীয় ও চীনা মাল আমদানি করতে পারব। এ ছাড়া পর্যটক, ছাত্র এবং রোগীরা ভারতে কিছুটা সুবিধা পাবে। তবে অবশ্যই আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে। এখানে সবারই উদ্দেশ্য হবে রফতানি বৃদ্ধি। আমরা যেমন রফতানি বৃদ্ধিকে মাথায় রাখি মুদ্রার মূল্যের ক্ষেত্রে তেমনি ভারত ও চীন তাই করে। এখন অবশ্য গোল বেঁধেছে অন্যত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় রফতানি বাজার। ভারত, চীন ও বাংলাদেশ সবারই বড় রফতানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পুঁজিবাদের নেতা, বাজার অর্থনীতির নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। উভয় দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে মালামাল আমদানিতে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। এর ফলাফল কী হবে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে দেখা যাচ্ছে চীনা অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। এই প্রথম তাদের মুদ্রার মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। শেয়ারবাজার তার ‘মার্কেট ক্যাপিটেলাইজেশন’ যথেষ্ট পরিমাণ হারিয়েছে। বহু বড় বড় কোম্পানি তাদের কারখানা চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। ‘রোড ও বেল্ট’ ইনিশিয়েটিভ-একবার মনে হয়েছিল এটা সবাই গ্রহণ করে নেবে। কিন্তু ইদানীং মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় ব্যাপারটা তা নয়। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বলছেন তিনি ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা’ (ডব্লিউটিও) মানেন না। এই সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এসব থেকে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্ব বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুনভাবে রচনা করতে চায়। এটি হলে আমাদেরও ভাবনার বিষয় হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বড় রফতানি বাজার। তারা একটু ‘মোচড়’ দিলেই আমাদের সমূহ ক্ষতি। ভিন্ন অর্থে বলা যায় সারা বিশ্বেই এখন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ধাবমান। বর্তমানের ‘মুদ্রামানে ধস’ এর একটা লক্ষণ। চীন, ভারত ও বাংলাদেশসহ এমানিং মার্কেটের অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলোও একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সবাই ‘ব্যাংকলেড’ উন্নয়নের নীতি অনুসরণ করে আজকের জায়গায় এসেছে। এতে মদদ যোগাচ্ছে বাজার অর্থনীতি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে দেখা যাচ্ছে বাজার অর্থনীতির নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের কথা বাজার অর্থনীতিতে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছে। ওমান থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের কারখানা সরিয়ে নিচ্ছে অন্যত্র যেখানে শ্রমের মূল্য কম। ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টিও তাদের চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ। অতএব ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বাজার নীতির’ নীতি নতুন করে লিখতে চাইছেন।
এদিকে বাজার অর্থনীতিতে আমাদের দেশগুলো ভালই করেছে। আমাদের মতো দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, রফতানি বেড়েছে, মাথাপিছু বেড়েছে, সবচেয়ে বড় কথা লাখ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছে। লাখ লাখ লোক এখন একবেলা, দুইবেলা ভাত খেতে পারছে। চীনেও তাই। সেখানে কমপক্ষে ৫০ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছে। মধ্যবিত্তের জন্ম হয়েছে। বিরাটসংখ্যক লোক এখন মধ্যবিত্তের কাতারে নাম লিখিয়েছে। এরাই নতুন বাজার। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্যত্র। বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে প্রকটভাবে। সারা বিশ্বের সম্পদ এক শতাংশ লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করছে ব্যাংকগুলো। বৈষম্য এমন একটা পর্যায়ে গেছে যেখানে তা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। শুধু বৈষম্য নয়, জলবায়ু দূষিত হয়েছে। সমাজ ভেঙ্গে তছনছ হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যে নতুন ধনাঢ্য ব্যক্তির জন্ম হয়েছে তারা স্ব-স্ব দেশ ছেড়ে দিচ্ছে। তারা তাদের সম্পদ পাচার করে নিয়ে নিচ্ছে উন্নত দেশে। কখনও কখনও নিচ্ছে কতিপয় দ্বীপ রাষ্ট্রে। সেই অর্থে দেশগুলো হয়ে পড়ছে বিত্তহীন ও মেধাহীন। এটা এক নতুন সমস্যা এরমধ্যে হয়েছে বিপত্তি। ছোট ও মাঝারি শিল্পের হয়েছে বিপদ। বিদেশী মালের প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারছে না। আমার ধারণা মতে আমরা এই মুহূর্তে একটা ক্রান্তিকালে। সমাজতন্ত্র চলেনি। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো সম্পদ তৈরিতে সাফল্য দেখাতে পারেনি। তারা বণ্টনে সাফল্য দেখিয়েছে। তাই সেই ব্যবস্থা ধসে পড়ে। মনে করা হয়েছিল বাজার অর্থনীতি আমাদের শেষ নিয়তি। কিন্তু এই বিশ-ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতাতেই দেখা যাচ্ছে বাজার অর্থনীতি নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি। ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা’ প্রশ্নের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইত্যাদিও প্রশ্নের মুখোমুখি। এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা চেষ্টা করছি টেকসই উন্নয়নের জন্য। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় বিশ্ব কোন্ দিকে যায়।

লেখক : ড. আরএম দেবনাথ

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি

এখনো নিয়মিত মৃত্যু সড়কে কে দায় নেবে
                                  

সংগত কারণে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হচ্ছে। ‘নিরাপদ সড়কের’ দাবি পূরণ ও প্রতিশ্রুতি পালনের কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না সড়কে, মহাসড়কে। নৈরাজ্য পূর্ববৎ অথবা যেন একটু বেশি মাত্রায়। হতে পারে আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় এমন এক বেপরোয়া ভাব বাস চালকদের, বাস মালিকদেরÑঅনেকটা বুড়ো আঙুল দেখানোর মতো কিংবা বিদেশিকেতায় ‘ভিক্টরি সাইন’। আমরা বিস্মিত, মর্মাহত।
কচি-কাঁচারা রাজপথে নেমেছিল, অবরোধ করেছিল দুই সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে, প্রতিবাদ প্রতিক্রিয়ার টানে। শান্তিপূর্ণ সে অবরোধকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় কত কী নাটকীয় ঘটনা আশ্বাস, অবিশ্বাস, হামলা, গুজব তৈরি, গ্রেপ্তার-রিমান্ড, ব্যাপক সামাজিক-শিক্ষায়তনিক প্রতিক্রিয়া, ঈদ উৎসব সামনে রেখে কিছু জামিন ও কয়েকটি মুক্তি ইত্যাদি।
এত সব ঘটনার পর কী অবস্থা সড়ক-মহাসড়ক তথা পরিবহনব্যবস্থার? ঈদ উপলক্ষে যাত্রা, ঈদের পর ফিরে আসা এবং আজতক ঘাতক বাসের বেপরোয়া চলাচলে কোনো পরিবর্তন নেই। সড়ক-মহাসড়কে ঝরছে প্রাণ। কোনো প্রতিকার নেই, চরম উদাসীনতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আর এ সুযোগে, এ উপলক্ষে যে মজার ঘটনা পত্রিকা পাঠকদের জন্য উপাদেয় খবর জোগাচ্ছে তা হলো, থেঁতলানো বাসের শরীর সারাই, রং মাখানো, লাইসেন্স আদায় এবং যথারীতি সড়ক পরিক্রমা। আর হেলপার-চালকদের ছোটাছুটি সনদ জোগাড়ের জন্য। এদের কর্তৃপক্ষ-প্রতিষ্ঠানের দিনরাত্রি একাকারÑবিশ্রাম হারাম।
একটি খবরে প্রকাশ, মিরপুরের অফিসে মিনিটে-সেকেন্ডে সনদ তৈরি হচ্ছে, হস্তান্তরিত হচ্ছে। আইন রক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থার চমকপ্রদ সমাপন। এরপর আর আইনি অভিযোগের সুযোগ নেই, কাগজপত্র ঠিকঠাক যেমন হেলপার-চালকদের, তেমনি তোবড়ানো থেঁতলানো বাসের নতুন চেহারার মালিকদের।
একেই বলে সিন্ডিকেট শক্তির মহিমা। এদের কাছে অসাধ্য কোনো কাজ নেই। হোক তা পরিবহন খাতে, কেনাবেচার বাজারে, ওষুধপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্য নির্ধারণে, হঠাৎ হঠাৎ নিত্যদিনের দরকারি কোনো কোনো জিনিসের অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনার কেরামতিতে। আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য পরিবহন খাত।

দুই.
এখানে চলছে ঐতিহ্যবাহী নৈরাজ্য অর্থের লোভে বেপরোয়া বাসচালক, শক্তির দম্ভে তার ঘাতক চরিত্রের প্রকাশ, তেমনি উদ্ধত অশিক্ষিত চালক-সহযোগী, যার প্রচলিত নাম হেলপার। বয়সে সে কিশোর বা তরুণ। নেপথ্য শক্তির কারণে তার ঔদ্ধত্যের প্রকাশ আরো বেশি, যাত্রীর প্রাণ তার কাছে কানাকড়ির দামে বিবেচিত। অনায়াসে সে চলন্ত বাসে যাত্রীকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে চাকার নিচে পিষে মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না। যুক্তি, সহিষ্ণুতা, মানবিক বোধÑএজাতীয় শব্দগুলোর সঙ্গে তার পরিচয় নেই।
তার জগৎটাই আলাদা। সেখানে জেঁকে বসে আছে অশিক্ষা, গ্রাম্যতা, আচরণের স্থূলতা, শক্তির দম্ভ ও ঔদ্ধত্য। চালক মহাশয়ও একই ধারার, তবে একটু উঁচুমাত্রার, তার ঘাতক চরিত্র আরো প্রকট, সেখানে রয়েছে আরো নানাবিধ উপসর্গ, রোগব্যাধি। আমরা তো ভুলে যাইনি বাসযাত্রায় মধুপুর জঙ্গলে হতভাগ্য ছাত্রীর করুণ কাহিনি। জানতে ইচ্ছে করে, কী ঘটেছে সেই বাসচালক ঘাতক ও তার সহযোগীর?
এ নৈরাজ্যিক অবস্থার সব দায় যে বাসচালক ও তার সহকারীদের, তা নয়। নেপথ্যে তাদের বড় শক্তি যেমনÑতাদের শ্রমিক ইউনিয়ন ও তার নমস্য নেতা, তার চেয়েও মহাশক্তিমান খুঁটি বাস মালিক সমিতির সিন্ডিকেট। তাদের পেছনে আবার রয়েছে রাজনৈতিক শক্তির নানা দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে তাদের পরিবহন মুনাফাবাজি সীমা-পরিসীমাহীন।
তারা পুরনো অব্যবহারযোগ্য বাস রংচং করে সুদর্শন সাজিয়ে পথে নামায়, এমনকি তা রাজধানীর রাজপথে প্রশাসনের নাকের ডগায়। ট্রাফিক নিয়মনীতি আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে তারা। পাঠক বা যাত্রী একটু খোলা চোখে এসব বাসের দিকে তাকালেই এদের হালচাল বুঝতে পারবেন। ট্রাফিক দিবসকালে এরা বিশ্রাম নেয়, তাদের বাসস্থানে বসে।
এখানেই শেষ নয়, চালকদের সঙ্গে মালিকদের চুক্তিভিত্তিক কর্মের যে অনিয়মি ব্যবস্থা চালু, যে কারণে বেপরোয়া চালক অর্থলোভের নেশায় রাজপথ ছেড়ে ফুটপাতে উঠে যায় প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্বে কিংবা সড়কের পাশে দোকানে ঢুকে পড়ে মৃত্যু ঘটায় কিংবা মহাসড়কে গাছ; তার-খুঁটিকে ধাক্কা মেরে পার্শ্ববর্তী খালে আশ্রয় নেয় যাত্রীদের সলিল সমাধি ঘটিয়ে। কখনো বা দুমড়ে দিয়ে যায় হালকা যানবাহন যাত্রীদের পিষ্ট করে।

তিন.
এই হলো সাম্প্রতিক ছাত্র-ছাত্রীদের ‘নিরাপদ সড়ক’ দাবি পূরণের পরিণাম পরিবহন খাতে। যে সহৃদয়তা নিয়ে, যে নমনীয়তা নিয়ে পরিবহন আইন সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার ফলাফল এমন হওয়াই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মহলের এক দীর্ঘদিন প্রচলিত শব্দ ‘কায়েমি স্বার্থ’ এখানে কার পক্ষে, বিপক্ষে ক্রিয়াশীল, তা জানেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক লেখকরা, হয়তো বা ভুক্তভোগী কেউ কেউ।
আমাদের এই বক্তব্য, অভিযোগ যে কল্পিত কিছু নয়, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার পর এবং সরকারি বিভিন্ন মহলের বারবার বিবৃতি, এমনকি টিভির টক শোতে সরকারপক্ষীয় বক্তাদের তর্কবিতর্কের পরও যে সড়কে হত্যাকা- চলেছে, তার প্রমাণস্বরূপ কিছু ঘটনা, উদাহরণ আমরা তুলে ধরব সংবাদপত্র থেকে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্থাৎ পত্রিকা পাঠ থেকে বলা যায়, প্রায়ই এমন শোকাবহ ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিকারহীনতার জেরে।
এই তো সেদিন একটি দৈনিক পত্রিকায় দুই কলামের একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘আমিনুলের পরিবারে কান্না থামছে না’ (৩০-৮-২০১৮)। সংবাদ বিবরণে প্রকাশ, কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়ে পরিবার-প্রধান আমিনুল ও তাঁর শিশুসন্তান নাবিল নিহত, অন্যরা আহত; প্রতিবেদকের বক্তব্য, ‘চালকের ভুলে’।
একই দিনে আরেকটি মারাত্মক ঘটনাÑশিরোনাম: ‘ওভারটেক করতে গিয়ে বাস কেড়ে নিল তিন প্রাণ’। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ‘রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মনিরা আক্তার (১৮)। একটি মাইক্রোবাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে তাঁকে চাপা দিয়ে চলে যায় যাত্রীবাহী একটি বাস’। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু। কে এ মৃত্যুর জবাবদিহি করবে?
একই রকম ঘটনায় আরো মৃত্যু। সড়কগুলো যেন মৃত্যু উপত্যকা। উদাহরণÑ‘নরসিংদীর শিবপুরে আরেকটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয় একটি যাত্রীবাহী বাস। এতে নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী দুজন।’ একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে গেলে মা-মেয়ে ও অন্য এক শিশুসহ নিহত তিনজন।
একই প্রতিবেদনে প্রকাশ, ‘ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে দুজন এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় জিপের ধাক্কায় মারা গেছেন মোটরসাইকেল আরোহী এক ছাত্রলীগ নেতা।’ এর পরও নিহতের খবর বাস-ট্রাক সংঘর্ষে। এ প্রতিবেদনের উপশিরোনাম : ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আরো ৯’। বলতে হয় মৃত্যুর মিছিল সড়কে।
কেন? ঘটনা বিশ্লেষণে আপাতত কারণ বাসের বেপরোয়া গতিতে চালনা, ওভারটেক করার বৈনাশিক প্রবণতা, চালকের বেহিসেবি চালনা আর সামগ্রিক বিচারে যানবাহন মাত্রেরই চলাচলে গতিসীমা, নিয়মনীতি না মেনে যেমন-তেমনভাবে চলা। না হলে বাস-ট্রাকে সংঘর্ষ হয়? এককথায় আচরণের দিক থেকে চরম ব্যক্তিক নৈরাজ্য যানবাহন চালনায়, মূলত বাসের সর্বাধিক ঘাতক ভূমিকা।
আমাদের প্রশ্ন : আন্দোলনোত্তর পর্যায়েও এই যে প্রাণহানি, এর দায় কার? অবশ্যই প্রত্যক্ষ দায় যানবাহন চালকের, পরোক্ষে মালিকের এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন অর্থাৎ সরকারের। শাসনযন্ত্র কি ভেবে দেখেছে নিহতদের পরিবারগুলোর বিপর্যস্ত অবস্থার কথা। নাগরিক মাত্রেরই নিরাপত্তা দেওয়ার দায়-দায়িত্বের কথা? না, তারা ভাবে না। ভাবলে এমন আইন তৈরি করত, তাতে এমন কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা রাখত যে ‘ওভারটেক’ করার প্রবণতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে চালককে দুইবার ভাবতে হতো।
ছাত্র-ছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন তাই ব্যর্থ। ব্যর্থ তাদের জন্য নয়, ব্যর্থ সরকারি ব্যবস্থার কারণে, ব্যর্থ মালিকদের উদাসীনতার কারণে। উদাসীনতা নিয়ম মানার ক্ষেত্রে, আর মূলত নিয়ম ভাঙা মুনাফাবাজির লোভ-লালসার কারণে। এমন একাধিক কারণে রাজপথে, সড়কে-মহাসড়কে যানবাহন চালনায় বিরাজ করছে চরম নৈরাজ্য।
সংবাদপত্রের দিক থেকে বিন্দুমাত্র ভুল নেই যখন তারা এমন শিরোনাম ছাপে : ‘সড়কে নৈরাজ্য আগের মতোই’ কিংবা এমন শিরোনাম : ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলার বিষয়টি উপেক্ষিত’। লেখে ‘যাত্রী তোলায় রেষারেষি’, ‘যত্রতত্র যাত্রী নামানো-ওঠানো’, ‘উল্টোপথে চলা, মুঠোফোন কানে চেপে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালনা’র বিশৃঙ্খল আচরণের বিষয়গুলো।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল রাস্তার সর্বপ্রকার যানবাহন নিয়ম মেনে, আইন মেনে চলুক, অদক্ষ চালক বা হেলপার-চালক যেন স্টিয়ারিং না ধরে, লাইসেন্সবিহীন চালককে যেন চালকের আসনে বসতে দেওয়া না হয়। সড়কে-রাজপথে এ সবকিছু চলেছে আন্দোলনের দিনকয়। আন্দোলন শেষ, নিয়মনীতিও শেষ। আবার শুরু সড়কে যানবাহন চলাচলের নৈরাজ্যিক রাজত্ব।
আমাদের সমাজ যে কত অমানবিক ও যুক্তিহীন তার প্রমাণ মেলে যখন আমরা আলাপে-সংলাপে, লেখায়Ñটক শোতে প্রায়ই সড়ক হত্যাকা-গুলোকে ‘দুর্ঘটনা’ নামে ঘাতককে ছাড়পত্র দিতে চাই। প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা বাস্তবে খুবই কম। পূর্বোক্ত একাধিক কারণ অসহায় যাত্রীদের মৃত্যুর কারণ। এগুলোকে হত্যাকা- ছাড়া কী বলা যাবে। রাষ্ট্রযন্ত্র এ বাস্তব ধারায় ভাবে না বলেই তাদের পরিবহন আইন অভাবিত রকম নমনীয়।
এ নমনীয়তার কারণে এক বাস হেলপার কদিন আগে এক যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে চাকায় পিষে মারতে দ্বিধা করেনি। কী বীভৎস হত্যাকা-! যুক্তিসংগত কারণে জনৈক কলামিস্টের লেখার শিরোনাম : ‘দুর্ঘটনা নয়, যাত্রী হত্যা!’ রেজাউল করিম হত্যার মতো জঘন্য হত্যাকা- বাসযাত্রায় একাধিকবার ঘটেছে। কিন্তু কঠিন শাস্তির অভাবে হত্যাপ্রবণতা কমছে না, বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা।
ক্ষুব্ধ মনে এসব অন্যায়, অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত লিখি, ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করি, সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেন ঘটনার হৃদয়স্পর্শী শিরোনাম দিয়ে প্রতিবেদন লিখে। তা সত্ত্বেও দেখি ‘নড়বড়ে বাসগুলোর শহরময় দাপাদাপি’; দেখি নিয়ন্ত্রণহীন বাস ফুটপাতে উঠে নিশ্চিন্ত পথিককে ধাক্কা মেরে দ্রুত উধাও। আরো দেখি মর্মস্পর্শী ঘটনা : ‘মায়ের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে’ শিশু আচমকা বাসের ধাক্কায় (৩১-৮-২০১৮)। সন্তান হারানো মায়ের সে কী কান্না!
আমাদের শাসনযন্ত্রে কর্মরত নারীÑঅর্থাৎ মায়েদের কি এসব ঘটনায় মুহূর্তের জন্য হৃদয়স্পন্দিত হয় না? মনে হয় না যে এই মা তাদের কোনো একান্তজন হতে পারতেন। না-ইবা হন স্বজন। মানুষ হয়ে কি নিরপরাধ মানুষ হত্যা সহা যায়? ওই সব ঘাতকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে কি মন চায় না?

আহমদ রফিক

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মাঠের লড়াইয়ে লক্ষ্য হোক জয়
                                  

দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কভুক্ত সাতটি দেশ নিয়ে প্রথমবার সাফ গেমস (সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন গেমস) অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে নেপালের কাঠমা-ুতে। আঞ্চলিক সর্ববৃহৎ ক্রীড়ানুষ্ঠানে অন্যান্য খেলার সঙ্গে ছিল ফুটবল। প্রথমবার সাফ ফুটবলের ফাইনালে বাংলাদেশ নেপালের কাছে ২-৪ গোলে পরাজিত হয়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে ফুটবলে সোনা জয়ের জন্য। প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়েছে অষ্টম সাফ গেমসে (১৯৯৯) নেপালের বিপক্ষে তাদের মাটিতে (১-০) গোলে পরাজিত করে। ফাইনালে গোল করেছিলেন আলফাজ আহমেদ। ১৯৯৯ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সব সময় স্মরণীয়।
শুধু ফুটবলের আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুভব করেই এর শুরু। সার্কভুক্ত দেশের পৌনে ২০০ কোটি মানুষের আঞ্চলিক ফুটবল উৎসব। ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। অগণিত ফুটবল প্রেমিকের কাছে ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’ দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ। তাই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ঘিরে উচ্ছ্বাস, আবেগ ও প্রত্যাশা অন্য রকম। ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে (২০০৩) প্রথম বাংলাদেশ ফাইনালে মালদ্বীপকে ১(৫)-১-(৩) গোলে টাইব্রেকারে পরাজিত করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি কখনো ভোলার নয়। এরপর গত ১৫ বছর ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সুযোগ মেলেনি। বিগত তিনটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তো গ্রুপ পর্বের বেড়া অতিক্রম করতে পারেনি। মধ্যে অবশ্য ২০১০ সালে এসএ গেমসের ফুটবলে ঢাকায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় দল।
বাংলাদেশে এবার নিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের (২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮) এটা তৃতীয় আসর। অর্থাৎ ৯ বছর পর আবার ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেরা প্রমাণের অনুষ্ঠান। ফুটবল রোমাঞ্চে ভরপুর ১২তম উৎসব। দেশের মানুষ ভালো ফুটবল উপভোগের প্রত্যাশায় আছে।
বিগত ১১ বারের চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত ট্রফি জিতেছে সাতবার। এতে এটাই প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে তারাই ‘সেরা’। তবে এই গ-ির বাইরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের অবস্থা ভালো নয়। এই ভারত কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জিতেছে। এখন এটা শুধু স্মৃতি।
আজ থেকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ১২তম সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ মাঠে গড়াবে বাংলাদেশ ও ভুটানের খেলার মাধ্যমে। ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের অপর দুই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ও নেপাল। ‘বি’ গ্রুপে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। দেশের জন্য জাতীয় দল খেলবে উজাড় করে দিয়ে। এশিয়াডে ভালো খেলা আশা জাগিয়েছে। বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছে। সিনিয়র-জুনিয়র খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গঠিত দলটি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলবে। খেলা উপভোগ করবে। অযথা স্নায়ুর চাপে ভোগা উচিত নয়।
দেশের মাটিতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ দেশের ফুটবলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। গত জাকার্তা এশিয়াডে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ২৩ (তিনজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের খেলার সুযোগ ছিল) আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, ভয়ডরহীন সাহসী নির্ভার ফুটবল খেলে এই প্রথমবার নক আউট রাউন্ডে খেলার সুযোগ করে নিয়েছে। এটা অনেক বড় অর্জন দেশের ফুটবলের জন্য। পাশাপাশি অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করার দাওয়াই। আমরা লক্ষ করেছি, এশিয়াডে ভালো খেলা দেশের ফুটবলকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করছে ফুটবলে তারুণ্যের বিকল্প নেই।
এশিয়াডের পর এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এ ক্ষেত্রে মাঠের লড়াইয়ের চরিত্রে পার্থক্য আছে। প্রতিটি দেশ থেকে জাতীয় দলের পুরনো ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা দেশের পক্ষে খেলতে নামবেন। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মেজাজও অন্য রকম। বয়সে তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব সময় অসুবিধার সম্মুখীন হয়, এটা ঠিক নয়। এবারের বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স। সেই দলের খেলোয়াড়দের বয়সের গড় কত ছিল? ফ্রান্সের তারুণ্য কিভাবে তাদের মাঠে এগিয়ে নিয়ে গেছে (সিনিয়র খেলোয়াড়ও সঙ্গে ছিলেন), পুরো বিশ্ব সেটা পর্যবেক্ষণ করেছে। অভিজ্ঞতার অবশ্যই মূল্য আছে। মাঠে সামর্থ্যরে সঠিক প্রয়োগ দেশের জন্য শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার পাশাপাশি জয়ের ক্ষুধা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একটি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। খেলোয়াড়রাই সফলতা রচনার আসল সৈনিক। কোচ বাইরে থেকে পরিকল্পনা ঠিক করে দেন।
এশিয়াডের আগে ইংলিশ কোচ জিমি ডে এবং তাঁর সহকারীদের অধীনে বাংলাদেশ দলের ২৩ অনূর্ধ্ব খেলোয়াড় ছাড়াও জাতীয় দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা নিবিড় প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। এটা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপেরও প্রস্তুতি ছিল। এ ক্ষেত্রে দেশের বাইরে কাতারে ক্যাম্প এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রস্তুতি ম্যাচগুলো খুব কার্যকর হয়েছে। আর এটা এশিয়াডে ভালো দলের বিপক্ষে খেলার সময় লক্ষণীয় হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ফিটনেস’। শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফিটনেসের বিষয় আগের বিদেশি কোচ গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় জিমিও এ বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এতে ফলও পাওয়া গেছে। আগের কোচ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেছেন। জিমিও বিষয়টি নিয়ে কঠোরভাবে কাজ করেছেন। একটা দলের ফিটনেস ও স্ট্যামিনা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করা ছাড়া (এটা চলমান প্রক্রিয়া) ৮-৯ সপ্তাহে অন্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। যেটা লক্ষণীয়, খেলোয়াড়রা পুরো বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিয়েছেন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পরপরই দেশের মাটিতে ছয় দেশের জাতীয় দল নিয়ে শুরু হবে ১ অক্টোবর থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বেশি।
গত ২৯ আগস্ট নীলফামারীতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ (স্টেডিয়াম-ভর্তি দর্শক প্রমাণ করে দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়েনি) ১-০ গোলে পরাজিত হয়েছে। এই পরাজয় প্রত্যাশিত ছিল না। অবশ্য পরাজয় বড় কিছু নয়। তবে এটা তো ঠিক জয় আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। উজ্জীবিত করে। সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে আরো চাঙ্গা হয়েই নামা সম্ভব হতো। কোচ সিনিয়র খেলোয়াড়দের পরখ করার পাশাপাশি তাঁদের সামর্থ্যতা দেখতে চেয়েছিলেন। কেননা বিদেশে তো তাঁরা খেলার সুযোগ পাননি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে জাতীয় দল গঠন করতে হবে। তাই এশিয়াডের ৯-১০ জন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়ে দল গঠন করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে দেশের ফুটবলের একটি বাস্তব ছবি পাওয়া গেছে। বিদেশি কোচ যা বোঝার বুঝেছেন। এ খেলায় সিনিয়র খেলোয়াড়দের মাঠে ভূমিকা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। পাশাপাশি ফুটবল ঘিরে নতুন করে চিন্তাভাবনার বিষয়টি আবার বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ২০ সদস্যের দলের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয়, কোচ জিমি ডে পুরনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্কোয়াডে নতুনদের পাশাপাশি পুরনোদের গুরুত্ব দিয়ে ২০ সদস্যের স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোচ এশিয়াডের দলকেই মাঠে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছেন। এতে বলা যাবে, বাংলাদেশ জাতীয় দলটা হয়েছে অভিজ্ঞ এবং তরুণ খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গঠিত। প্রকাশ্যেও উচ্চারিত হয়েছে লক্ষ্যভাগে খেলা। দেশে খেলা হবে, মানুষের প্রত্যাশা তো অবশ্যই বেশি, তবে এটা কি অবাস্তব। প্রথম ম্যাচটিই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এগিয়ে গেলেই মাঠের লড়াই সহজ হবে। খেলোয়াড়দের লক্ষ্য জয়।
২৩ অনূর্ধ্ব দল এশিয়ান গেমসে ভালো ফুটবল খেলেছে। আমরা এ দলের মধ্যে সম্ভাবনার একটা ইতিবাচক শক্তি অনুভব করতে পেরেছি। ফুটবলকে অবদমন থেকে বের করে টেকসই একটা ভবিষ্যৎ গড়তে তারুণ্যের শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা, সৃজনশীলতা ও গভীর আবেগের প্রয়োজন। তারুণ্য শক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে এরাই পারবে। এরাই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আসল সৈনিক। আমাদের ফুটবল একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফুটবল নিয়ে স্বস্তি নেই। কমবেশি সবাই ফুটবল ঘিরে হতাশ। আর এটাই বাস্তবতা। ফুটবল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। এর জন্য নতুন উদ্যোগ ও সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তারুণ্যের প্রাণশক্তি আর তাদের সামর্থ্যতা ছাড়া উপায় নেই। তারুণ্যের দিকে তাকালে, তাদের নিয়ে কাজ করলে আমরা প্রতিদিনই আশাবাদী ও সাহসী হতে পারব। ফুটবলের উন্নয়নে সবাই একই নৌকার যাত্রী। এই যাত্রীর মধ্যে বিভিন্নভাবে বিভাজন তৈরি করা হলে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না।

ইকরামউজ্জমান

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশায়
                                  

পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যে ‘মোহন সিরিজ’ বলে একটা রোমাঞ্চ-সিরিজ কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। এর স্রষ্ঠা ছিলেন শশধর দত্ত। দস্যু মোহন নামক এক রবিনহুড মার্কা গরীবের বন্ধু ছিল ওই সিরিজের নায়ক। তা দস্যু মোহন যখন কাউকে ধমক দিয়ে মুখ বন্ধ করতে বলত, তখন তার একটা ‘কমন’ উক্তি ছিল : রসনা সংযত কর যুবক। আজকালকার দস্যু মোহনদের সাধু ভাষায় ধমক দেওয়ার মত অত সময় নেই, তারা মুখের কাজ হাতেই সেরে নেয়। প্রয়োজনে একটা গুলি বাজে খরচ করতেও ইতস্তত করে না। আজকাল ‘রসনা সংযত’ করার মত কঠিন বাংলা ব্যবহার না করে সহজবোধ্য বাংলায় বলা হয় ‘মুখ সামলে কথা বল, শা...’। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ না হলে লাঠিসোটা মায় ছুরি-পিস্তলের ব্যবহার তো আছেই।
হিন্দি ছায়াছবির বদৌলতে আরেকটি ডায়ালগও আমাদের নিকট খুব পরিচিত। সেটিও প্রয়োগ করা হয় একই উদ্দেশ্যে। ডায়ালগটি হচ্ছে : যবানকো লাগাম দো, কমিনে। এর অর্থও ওই ‘মুখ সামলে কথা বল, শা...’-এর মত। তবে মোহন সিরিজের বাক্যটি আর যাই হোক, শ্লীলতাবর্জিত নয়। অন্য দু’টি নিঃসন্দেহে কুবাক্য। অতএব, পরিত্যাজ্য।
এবং কুকথা-কুবাক্য যে শুধু দুর্জনের শোভা পায়, এটা আমাদের শ্রদ্ধাস্পদ রাজনীতিকরা খুব ভালো করেই জানেন। তাই তো দেখি ,তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে কখনোই তাঁরা অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করেন না। এজন্য তাঁদের আমরা অবশ্যই সাধুবাদ দেব। কোনো দুর্মুখও নিশ্চয়ই বলতে পারবে না, তাঁদের কণ্ঠনিঃসৃত বাক্যের কারণে আমাদের কোমলমতি (মতিগতি কোমলই হোক আর কঠিনই হোক, সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিশু-কিশোরদের কথা বলতে গিয়ে এই অভিধাটি পত্রপত্রিকায়, প্রবন্ধ-নিবন্ধে, আলাপ-আলোচনায় আকছারই ব্যবহৃত হয়েছে ও হচ্ছে। এবং তা যথার্থই। আমাদের উচিত হবে এমন কিছু না করা, যাতে শিশু-কিশোরদের মনোজগতে কোনো প্রকার কুপ্রভাব পড়ে। শৈশবে-কৈশোরে তারা যাতে সত্যিকার অর্থে কোমলমতি থাকে, সেদিকে অবশ্যই আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।) বালক-বালিকারা ব্যাকরণবিরুদ্ধ অশ্লীল ভাষা শিখছে। আবারও বলি, সাধু! সাধু!! আমরা আশা করব, আমাদের রাজনীতিকরা তাঁদের কথাবার্তায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতে অশ্লীলতাবর্জিত বাক্য গঠনে এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন অব্যাহত রাখবেন। অকথা-কুকথা না বলেও সুচিন্তিত সুবিন্যস্ত চারুবাক্যের মাধ্যমে যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়, তার উদাহরণ তো ইতিহাসে ভূরি ভূরি আছে।

দুই.
এ তো গেল আমাদের রাজনীতিকদের বক্তৃতা-বিবৃতির ভাষার শ্লীল-অশ্লীল প্রসঙ্গ। এতে তাঁরা দশে দশ পেলেও তাঁদের বক্তৃতার অন্যান্য দিক যেমন বক্তৃতার বিষয়বস্তু, প্রতিপক্ষের প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন, রাজনৈতিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকা, উস্কানিমূলক কথাবার্তা না বলা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের পারফরম্যান্স, মাপ করবেন, রীতিমত হতাশাব্যঞ্জক।
আর কয়েক মাস পরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই হাওয়া এখন আর নিদাঘের দিনান্তে কোমল পরশ বোলানো দখিনা মলয় নয়, এটি এখন বিকিরণ করতে শুরু করেছে উত্তাপ। এটা ঝড়ের পূর্বাভাসও বটে। বলা যায় নির্বাচনী ঝড়। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ কিংবা জানুয়ারির শুরুতে আঘাত হানবে এই ঝড়। নির্বাচন কমিশনের আবহাওয়াবিদরা তেমন ঘোষণাই দিয়েছেন। অতএব ‘কা-ারি, হুঁশিয়ার’। সতেরো কোটি যাত্রী শঙ্কাকুলচিত্তে তাকিয়ে আছে এই মুহূর্তের কা-ারিদের দিকে। তাঁরা কি মাথা ঠা-া রেখে, সব বাদ-বিসংবাদ ভুলে দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারবেন, তরী ভিড়াতে পারবেন কূলে? নাকি সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে কূটকচালে জড়িয়ে পড়ে কাজের কাজটি করতেই যাবেন ভুলে, আর আলগা হয়ে যাওয়া মুঠি থেকে হালটা সরে গিয়ে ডুবে যাবে তরী? খোদা না করুন। কিন্তু চারদিকের আলামত দেখে গতিক বড় ভালো ঠেকছে না। খবরের কাগজ আর টিভি খুললেই দেখি আমাদের ভাগ্যবিধাতারা ব্যস্ত পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়িতে। নিজেদের ঘর গোছানোতে মনোযোগ দেওয়ার চাইতে অন্যের ঘরে আগুন দিয়ে তাকে কী করে গৃহহীন করা যায় মনোযোগটা যেন সেদিকেই বেশি। (এতে যে নিজের অজান্তে নিজের কাপড়ের খুঁটে আগুন লেগে যেতে পারে, সেদিকে খেয়াল নেই।)
সব কাজেরই যেমন একটা উদ্দেশ্য থাকে, এই অহোরাত্র সংকীর্তনের মত অহোরাত্র গলাবাজি করে নিন্দাবাদেরও অবশ্যই একটা উদ্দেশ্য আছে। সেটি হচ্ছে শ্রোতৃম-লীর আস্থা অর্জন। তাদের বোঝানো, আমরা ড্রাই ওয়াশ করা তুলসীপাতা, আর ওরা হচ্ছে সর্বাঙ্গে জ¦ালা ধরানো বিছুটি পাতা। আমাদের সকাল-সন্ধ্যা ছেঁচে রস করে খাবেন, সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ক্যান্সার পর্যন্ত সব রোগ-বালাই সেরে যাবে। আর ওদের ত্রিসীমানায়ও যাবেন না। গেছেন কি মরেছেন। এমন জ¦লুনি-পুড়ুনি-চুলকানি শুরু হবে যে মনে হবে বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিয়ে জ¦ালা জুড়ান।
আমাদের সাধারণ মানুষ মোটামুটি সরল বিশ্বাসী, এ কথা সত্য। তারা সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলেই জানে। কেউ যদি গলার জোরে সাদাকে ধূসর আর কালোকে বাদামি বলে তাদের কাছে চালাতে চায়, তখনই ধন্দে পড়ে তারা। গোস্তাকি মাফ, রাজনীতিকরা প্রায়শ এই কাজটিই করে থাকেন। এবং এটা তাঁরা করেন একটা ভুল ‘প্রেমিস্’ বা ভিত্তি থেকে। তাঁদের ধারণা, তাঁরা যা বলেন সাধারণ মানুষ সেটাই কোনো যাচাই-বাছাই না করে বেদবাক্য বলে গ্রহণ করে। তাঁরা কখনো কখনো এও মনে করেন, গাঁও-গেরামের কিংবা বস্তিবাসী মানুষের বিদ্যাবুদ্ধি নেই, তাদের জ্ঞানের পরিধি নিতান্তই সীমিত, অতএব তাদের যা বলব তাই তারা মেনে নেবে। (ময়দানি ভাষায়, তাই তারা ‘খাবে’।) এটা হয়তো অতি অল্পসংখ্যক লোকের বেলা সত্য। কিন্তু সব মানুষকে এভাবে অবমূল্যায়ন করা, তাদের বিচার-বিবেচনাকে কটাক্ষ করা অন্যায়। এটা তাদের অপমান করার শামিল। আর তা ছাড়া যেসব বিষয় নিয়ে বক্তারা, তাঁদের মতে, অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরে কোনো দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, সেই সব জীবনজগতজনিত বিষয়াদি সম্বন্ধে হাজিরানে মজলিস মোটামুটি ওয়াকিবহাল থাকেন। আফটার অল, তারা তো এই দেশেরই বাসিন্দা। এই দেশে অতীতে যা ঘটেছে বা এখন যা ঘটছে, সব কিছুর সাক্ষী তো তারাই। কাজেই তাদের কাছে গলাবাজি করে কিছু বলা মার কাছে মামাবাড়ির গল্প বলার মতই। তবু আমাদের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অভ্যাস, তাঁরা তাঁদের স্ব স্ব ঢোল যতক্ষণ না ফেটেছে ততক্ষণ পেটাবেনই।
ঢোল পেটান, আপত্তি নেই। আপনার ঢোল আপনি পেটাবেন-ফাটাবেন, না কোলবালিশ করে শয্যাসঙ্গী করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তবে ঢোলের বাদ্যেরও একটা ছন্দ-ছাদ আছে, গ্রামার আছে। সেটা মেনে চললে ওই বাজনা অত পীড়াদায়ক মনে হয় না পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে। কিন্তু তা না করে সারাক্ষণ উল্টাপাল্টা ধুড়ুম-ধাড়ুম পেটাতে থাকলে কতক্ষণ ভালো লাগে বলুন। এখন তো এমন হয়েছে টিভি খুললেই শোনা যায়, এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে কুৎসা আর নিন্দা ছড়াচ্ছে। ভদ্র ভাষায় যতটুকু ধোলাই দেওয়া যায় তাই দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। হুমকি-ধমকি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও কারো কারো আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি (‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’) দেখে মনে হয়, এরা যেন একটা যুদ্ধ না বাধিয়ে ছাড়বেন না। বক্তৃতা তো নয় যেন এক ধরনের শক্তি প্রদর্শন। বললেই বলবেন, এটা না করলে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখব কী করে। যেন কর্মীবাহিনী নয়, রণক্ষেত্রের সেপাই সীমান্তরেখার এপাশে রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেনাপতি মহোদয় জ¦ালাময়ী ভাষায় শত্রুপক্ষের মু-ুপাত করেই চলেছেন!

তিন.
তবে ইদানীংকালের বক্তৃতা-বিবৃতি-ভাষণের মধ্যে দুটি জিনিস আমার কাছে সবচেয়ে আপত্তিকর মনে হয়। এক হচ্ছে বক্তৃতার ভাষা। এতে গালি-গালাজ নেই ঠিকই, তবে যে বাংলা ভাষা তার সৌকুমার্য ও কিছুকিছু স্বকীয়তার জন্য আবহমানকাল ধরে সব ভাষাভাষী মানুষের অবিমিশ্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়ে আসছে, তার প্রতি আমাদের কোনো কোনো শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তির ঔদাসীন্য রীতিমত দুঃখজনক। এরা অনেক জীবিত ও মৃত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন প্রাপ্য সম্মানটুকু প্রদর্শন না করে। না, আমি বলছি না কারো নামের আগে মাননীয় বা শ্রদ্ধেয় ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতেই হবে কিংবা অমুক মহোদয় বা মহোদয়া বলতেই হবে। কিন্তু বাংলা ভাষায় আমরা নিশ্চয়ই বলি না বা লিখি না, রাষ্ট্রপতি বলল, মন্ত্রী এলো, মওলানা ভাসানী বলেছিল, শিক্ষক ক্লাসে বাংলা পড়াচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ লক্ষ করে দেখবেন, আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় কেউ কেউ তাঁদের বক্তৃতায় ও কথোপকথনে প্রতিপক্ষের কোনো ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে দিব্যি এ ধরনের অসূয়া ও অবজ্ঞাসূচক বাক্য অনর্গল বলে যাচ্ছেন। এতে ব্যক্তিবিশেষের সম্মান-অসম্মানের কিছুই হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না, কিন্তু বক্তার ঔদার্যের অভাব ও ভাষার ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা কানে বড় বাজে। বক্তা সম্বন্ধে সাধারণ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র নয়। মনে হয় যেন বক্তার একধরনের অহমিকা প্রকাশ পায়। যেন বক্তা সাধারণ সৌজন্য প্রকাশের ধার ধারেন না। আর আশ্চর্যের বিষয়, এ ধরনের শীর্ষস্থানীয় বক্তাদের আশপাশে যে স্তাবককুল সারাক্ষণ মক্ষিকার মত ঘুরঘুর করে, তারা কখনো বিষয়টি বক্তার নজরে আনে না, পাছে তিনি রুষ্ট হন এবং তারা চাকরি খোয়ায়!
অন্য বিষয়টি নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট করার জন্য একাই এক শ। সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর উঠতে-বসতে উস্কানিমূলক বক্তব্য দান। কথাবার্তায় শিষ্টাচারের অভাব আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের পুরনো ব্যাধি। সেটিও হয়তো সহ্য করা যায়। কিন্তু পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধানোর জন্য কেউ কেউ যেন মুখিয়ে আছেন। এরা খোঁচা না মেরে, খোঁটা না দিয়ে কথা বলতে পারেন না। আর সেসব হুল ফোটানো কথাও একেবারে সরাসরি। কোনো রাখঢাক নেই। এতে করে পরিবেশ-পরিস্থিতি খারাপ হতে বাধ্য। প্রতিপক্ষ তখন ঢিলটির বদলে পাটকেলটি মারবেই। ব্যস! এভাবে বাগ্যুদ্ধ থেকে লেগে যাবে বন্দুকযুদ্ধ। আর যুদ্ধ হবে রাজায় রাজায়। সেই যুদ্ধে কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দেবে না। আখেরে জান যাবে কার? নিরীহ পাবলিকের। যারা এই লড়াইয়ের ‘গনিমতের’ এক পয়সাও পাবে না। সেই পুরনো কথা : রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার জান যায়। উলুখাগড়া বেচারা তো রাজ্য-রাজত্ব কিছুই চায় না। সে কেবল তার এক ইঞ্চি ভূমিতে শান্তিতে অবস্থান করে আলো-বাতাস-জলটুকু নিয়ে বাঁচতে চায়।

চার.
আমাদের প্রবল প্রতাপান্বিত নেতৃবৃন্দের প্রতি সামান্য একটি আরজ : আপনারা আপনাদের রাজনৈতিক টে-লদের কথায় কান না দিয়ে একটিবার গ্রামের অলিমদ্দি-সলিমদ্দি, বস্তির কটাই-মজররা কী বলে শোনেন তো। তারা কি মারদাঙ্গা আর ফিতনা-ফ্যাসাদের নির্বাচন চায়, না নির্বিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে নিজের সাত রাজার ধন, বড় আদরের, বড় আশার ভোটটি দিতে চায়? তাদের কাছে যখন ভোট চাইতে যান তখন তারা কি একান্তে আপনাকে বলে না, ‘চাচাজি, আপনি ভোট চাইতাছেন, নিশ্চয়ই আপনারে ফিরাইয়া দিমু না, তয় দেইখেন, নিজের ভোটটা যেন শান্তিতে নিজে দিতে পারি। এই ভোট লইয়া দাঙ্গা-ফ্যাসাদ শুরু অইলে আমরা তো বৌ-বাচ্চা নিয়া না খাইয়া মরুম।’ আর ভোটের হল্লা-গল্লায় এটাই লাখ কথার এক কথা।
তা হলে ‘মরাল অব দ্য স্টোরি’ কী? এত দিনের এত অভিজ্ঞতা, এত হাউকাউ কূটকচালি একদিকে, আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরেক দিকে। নির্বাচনে কে জিতল, কে হারল তা নিয়ে সাধারণ মানুষের (ভুলে যাবেন না তারাই কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ) খুব একটা মাথাব্যথা নেই। তারা জানে, ভোটের ফলাফলে তাদের ভাগ্যের কোনো ইতরবিশেষ পরিবর্তন হবে না। তাদের কপালে সেই মোটা চালের ভাত, শুঁটকি পোড়া, ছেঁড়া লুঙ্গি, ছেঁড়া শাড়িই যদি বহাল থাকে, তবেই শুকুর আলহামদুলিল্লাহ, যদিও দেশ নাকি উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে, মাথাপিছু আয় (ইস্, এর মাজেজাটা যে কী তা যদি উম্মি মানুষগুলোকে কেউ বুঝিয়ে বলত!) নাকি এক লাফে উঠে যাবে মগডালে।
হোক যা খুশি, তবু দয়া করে একটু শান্তিতে থাকতে দিন দেশবাসীকে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

আর কত রক্ত ঝড়বে জাতির বিবেকের?
                                  

২৮ আগষ্ট ঢাকার সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে। দায়িত্ব পালনকালে সম্প্রতি ঢাকার রাস্তায় সাংবাদিকদের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা করে। হামলাকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারের দাবিতে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে যখন সাংবাদিক নেতারা ঘরে ফিরছিলেন তার ১২ ঘন্টার মাধ্যেই পাবনায় একজন নারী সাংবাদিক খুন হলেন। আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা আক্তার নদীকে (৩২) ২৮ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার নিজ গৃহে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। কেন এই হত্যাকান্ড? কারা হত্যা করলো সুবর্ণকে তা জানা জরুরী। এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড তাতে কোন সন্দেহ নেই। হরহামেশাই সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশের হাত ওঠছে। সাংবাদিকরা খুন হচ্ছে। এভাবে চলে না। সাংবাদিক হত্যা আর কত সইবে জাতি? আর কত রক্ত ঝড়বে জাতির বিবেকের? সাংবাদিকতা পেশার নিরাপত্তা খুব জরুরী হয়ে পরেছে।

রাজপথে পুলিশ পেটায়, পাবনার সুবর্ণার মত সাংবাদিকদের ঘরে লাশ বানায় দুবৃত্তরা। অপকর্মের সংবাদ প্রকাশ হলে সরকারি দল, বিরোধী দল সাংবাদিকের উপর চড়াও হয়। পুলিশ, মাদক ব্যবসায়ী সাংবাদিকে পিছু নেয়। চেনা মাস্তান, অচেনা সন্ত্রাসী কারনে অকারনে সাংবাদিকদের পেটায়, রক্তাক্ত কেেও, খুন করে গুম করে। সাংবাদিকরা আহত হলে, নিহত হলে কতক সাংবাদিক ব্যানার হাতে রাস্তায় নামে। পুলিশ,প্রশাসনের লোকজন, রাজনীতিবীদ ছুটে আসেন, সান্তনা দেন এই পর্যন্তই। আশ্বাস মেলে ভুঁড়ি ভুঁড়ি। সান্ত¡নার বাণী, আশ্বাস মিললেও বিচার মেলে না। আর বিচারহীন সাংস্কৃতি সাংবাদিক নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সাংবাদিক পেটালে যদি কিছু না হয়, তাহলেতো রাস্তা ঘাটে সাংবাদিকরা মার খাবেই। সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সরকারকে যথাযথ ভাবে পালন করতেই হবে।
সাংবাদিকরা যাই লিখুক, সেটা কারো না কারো বিপক্ষে যায়, কেউ না কেউ ক্ষুব্ধ হয়। আর তাতেই সংক্ষুব্ধ পক্ষ মারমুখী হয়। সুযোগ পেলে গায়ে হাত তোলে, রক্তাক্ত করে, গুম করে, খুন করে। সাংবাদিকদের কোনো বন্ধু নেই, বন্ধু থাকতেও নেই। তারা সমাজের, দেশের অন্যায়, অসঙ্গতি তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের উপর সম্মিলিত আক্রমণ দেখে মনে হয়, সাংবাদিকরা ঠিক পথেই আছেন, নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছেন। ওদের উপর পুলিশও ক্ষেপে, সন্ত্রাসী, রাজনীতিবিদ, মাদক ব্যবসায়ী সবাই চটে থাকে সব সময়। সাংবাদিকরা তো কারো সন্তুষ্টির জন্য লিখবে না। তাই সবার চুক্ষুশূল হয় একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকরা স্বাধীন মত প্রকাশ করতে গিয়ে যদি একের পর এক সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটে কিংবা সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন তাহলে এর চেয়ে হতাশাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় সাংবাদিক নির্যাতন, নিগৃহের ঘটনা অত্যন্ত দু:খজনক ও নিন্দনীয়। বিষয়টি উদ্বেগজনকও। এমন ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ শঙ্কিত না হয়ে পড়ে না। এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতরা যারই পৃষ্টপোষকতা পাক না কেন তাদের কোন ছাড় দেয়া সরকারের সমচিন হবে না।
প্রশ্ন হলো সাংবাদিকদের উপর কেন একর পর এক হামলা ঘটনা ঘটছে? কোনো সরকারের হাতেই প্রণীত হয়নি একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন। এমনকি দেশে অব্যহত সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটলেও কোনো খুনের বিচার প্রক্রিয়াই সুষ্ঠুভাবে এগোয়নি। সাংবাদিকরা প্রতিবাদি হওয়ায় পরে পুলিশ কিছুটা সোচ্চার হয়। আরেকটি বড় বিষয় সাংবাদিকদেও নিজেদেও মধ্যে ঐক্যেও অভাব। তাই দেশে সাংবাদিক নির্যাতন দিনদিন বাড়ছেই। ঘটনা ঘটিয়ে পার পেলে যা হয় তাই হচ্ছে। দেশে সাংবাদিক হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি একটিরও। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দিনের পর দিন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে সাংবাদিকতা পেশা ক্রমাগতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথাগত দুঃখপ্রকাশ ও হামলাকারীদের শাস্তির আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সাংবাদিকদের পেশায় এ চলমান ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্র কি কোনো উদ্যোগ নেবে? সাংবাদিক সমাজের জন্য দূর ভবিষ্যতে কি কোনো উজ্জ্বল আলো অপেক্ষা করছে? বিশ্বের যেসব দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না, সে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সাংবাদিক খুন হয় আর তার বিচার হবে না তা কী করে হয়?
পরিসংখ্যানটি আঁতকে ওঠার মতো। গত দেড় যুগে ৫১ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই দেশটিতে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ঘটনা থেকে শুরু করে সাংবাদিক হত্যাকান্ডের একটি ঘটনার সঠিক বিচার হয়নি। খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকরা নিজেরাই খবর হচ্ছেন। প্রতি বছরই একাধিক সাংবাদিকের অপঘাতে মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সারা জীবন সত্যের পেছনে ছুটে বেড়ানো এসব সাংবাদিকের হত্যা রহস্য হিমশীতল বরফের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। শুধু বিচারই নয়, একটি হত্যাকান্ডেরও রহস্য প্রকাশিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাপন করছে স্বাভাবিক জীবন। কেউ কেউ রয়েছে জামিনে। কেউ আবার মিডিয়াতেই কর্মময় জীবনযাপন করছে। অনেক হত্যাকান্ডের বিচারকার্য এমনকি তদন্ত কাজ, চার্জশিট ঝুলে আছে। কয়েকটি মামলার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সময় নিয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এ দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিক হত্যারও বিচার না হওয়া রাষ্ট্রের অমার্জনীয় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায় কোন সরকারই এড়াতে পারবে না।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ, আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, কোন সাংবাদিক হত্যাকা-েরই বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে হরদম। সরকারকে এসব হত্যাকান্ডের বিচারে অবশ্যই আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে। কোন একটি মামলার বিচারকার্য আজ পর্যন্ত সুরাহা হয়নি। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। ফলে তারা সাংবাদিকদের বাসগৃহে প্রবেশ করে নৃশংসভাবে হত্যা করার মতো স্পর্ধা দেখাতেও পিছ-পা হচ্ছে না। আমরা চাই, দেশে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হোক। এটি একটি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। এখন আর মুখের কথায় কেউ আস্থা স্থাপন করতে চায় না। সাংবাদিক নির্যাতন আর হত্যাকান্ড নিয়ে কোন টালবাহানা দেশের জনগণ ও সাংবাদিক মহল মেনে নেবে না। তাই সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ও বাস্তবিক পদক্ষেপ নিয়ে অতি সত্বর মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করবে এটাই আমরা বিশ্বাস করি।
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, প্রতারক, ব্লাকমেইলার ও ভীতিকর কোনো প্রাণী, এমন ধারণাই পোষণ করে দেশের গরিষ্ঠ মানুষ। প্রকৃত সাংবাদিকরা এর কোনটাই নন। সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এটা কেবল পেশা নয়, একজন সাংবাদিক এ সেবায় থেকে মানুষকে সেবা দিতে পারেন। দেশের কতিপয় অসৎ সম্পাদক, সাংবাদিক অর্থের বিনিময়ে সারাদেশে নানা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেও সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দিয়ে এ পেশার সম্মান হানি করছে। এরা সাংবাদিক নন। সাংবাদিক নামধারি। এদের কতকের কারনে সাংবাদিকতা যে একটি অনন্য পেশা তা দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না। এখনও সংবাদপত্র জনগনের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বলেই দেশের মানুষ অনেকটা শান্তিতে আছেন। সৎ সাংবাদিকতার জায়গাটা বিলুপ্ত হলে দেশে দুর্ভোাগ নে আসবে। একটি সংবাদপত্র আতœ প্রকাশের সঙ্গে সারা দেশের হাজার হাজার সাংবাদিকের ঘাম-শ্রম ও জীবনঝুঁকি জড়িত। গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমহীন কাজ করতে হয় অনেক সংবাদকর্মীর। অনেকটা নিশাচরের ভূমিকা তাদের। সাংবাদিকদের পারিবারিক জীবন বলতে কিছু নেই। কিন্তু কিছু অসৎ এবং ভুয়া সাংবাদিকদেও কারনে সাংবাদিকদের মূল্যায়ন সমাজে নেই বললেই চলে। পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি তো রয়েছেই। সমাজের অনেক সাংবাদিক ত্যাগী, নির্লোভী ও সৎ। তারা মানবকল্যাণে, সমাজকল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। এই দিকটিও সরকারকে আমলে নিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যা বন্ধ করা না গেলে সৎ, মেধাবী, যোগ্য, তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা এখন যে সংবাদপত্রে ঢুকছেন, তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এমনিতেই সাংবাদিকদের পেশাগত নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নেই, তার ওপর যদি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাদের জীবনঝুঁকি বেড়ে যায় কিংবা তারা হামলা-হত্যার শিকার হন তাহলে কিভাবে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই এবং এর কোনো বিকল্প নেই।
সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, কোনো সাংবাদিক হত্যাকা-েরই বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে হরদম। সরকারকে এসব হত্যাকা-ের বিচারে অবশ্যই আন্তরিক ও কঠোর হতে হবে। আতঙ্কের কথা হলো, সাংবাদিকরা খুন হচ্ছেন নিজের ঘরেই। খোদ ঢাকায় নিজ গৃহে সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি ও সাগর-রুনি দম্পতি খুন হয়েছেন। রাজধানীতে থানার ছাদ থেকে ফেলে এক সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। দিনের পর দিন এই হত্যাকা- বেড়েই চলছে। গত দেড় যুগে খুন হওয়া ৫১ সাংবাদিকের মধ্যে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শাসনামলে ১৯ সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকাতেই খুন হয়েছেন ১০ সাংবাদিক। বিভিন্ন তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের শাসনামলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হয়েছেন ৩৪০ সাংবাদিক। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে খুন হয়েছে ১০ সাংবাদিক।
সাংবাদিকরা জাতির বিবেক বলে বিবেচিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্বসহকারে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অনিয়ম, অসঙ্গতি কলমের ডগায় তুলে আনেন তারা। বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার সঙ্গে পৌঁছে দেন সাধারণ মানুষের কাছে। বর্তমান বিশ্ব ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নখদর্পণে। তাই মুহূর্তের মধ্যে সংবাদ চলে আসে জনসাধারণের দোরগোড়ায়। আর এসব সংবাদ পৌঁছে দিতে প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা তাদের সর্বোচ্চ মেধা, শ্রম, দায়িত্ব ও আন-রিক সেবা বিনিয়োগ করেন। এসব তথ্য ও অসঙ্গতি তুলে ধরে যেমন দেশের নাগরিকদের তাদের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলেন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদেরও বাধ্য করেন সঠিক পথ অনুসরণ করে সঠিক কাজটি করতে। এর ফলে অনেক সাংবাদিকই হয়ে ওঠেন অশুভচক্রের চক্ষুশূল। সংবাদ সংগ্রহ ও উপস্থাপনকারীর জীবন হয়ে ওঠে বিপন্ন। তবু প্রাণের ঝুঁকি জেনেও কখনও তারা থেমে থাকেন না দায়িত্ব পালনে। যে কোনো প্রতিকূল পরিসি’তিকে মোকাবিলা করে সত্যের সন্ধানে ছুটে চলেন দেশ-বিদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। যুদ্ধ, অগ্নিকা-, যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক, ঝড়-তুফান কিংবা মাদক বা সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় ভয়াবহ বিপদ মাথায় নিয়ে ঢুকে পড়েন। একজন সৎ সাংবাদিক বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন অন্তরালের অনেক অজানা তথ্য। উদ্ঘাটন করে নিয়ে আসেন ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা গূঢ় রহস্য। কিন্তু এর কোনোটাই একেবারে সহজসাধ্য কোনো কাজ নয়। এসব কাজে যেমন আছে সম্মান, তেমনি আছে মারাত্মক ঝুঁকিও। তাই আমরা বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের নানাভাবে প্রতিপক্ষের জিঘাংসার শিকার হতে দেখি। নির্যাতিত ও নিপীড়িত হতে হয় তাদের।
অবস্থাদৃষ্টে অকপটে বলতে হয়, আমাদের দেশের সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। গত দেড় দশকে একজন সাংবাদিক হত্যারও বিচার না হওয়া রাষ্ট্রের অমার্জনীয় ব্যর্থতা। তাই সাংবাদিকরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, তত্ত্বাবধায়ক কোনো সরকারই এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। আমরা সাংবাদিক হত্যাকান্ড এবং নির্যাতনের সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চাই।

(লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, গবেষক।)

 

হুমকিতে নয়, আলোচনায়ই সমাধান
                                  

চীনা বিপ্লবের পর সে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে আদর্শিক ঝাঁজ ছিল খুব প্রখর। সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিমান রাষ্ট্রনায়ক জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর (১৯৫৩) পর সেখানকার নব্য নেতৃত্বের আদর্শিক খাতে ভিন্নধারায় শিথিলতার প্রকাশ ঘটতে থাকে, যা চিহ্নিত হয় সংশোধনবাদরূপে। শুরু হয়ে যায় মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্ব, প্রথমে নিঃশব্দে, পরে প্রকাশ্যে। রুশি প্রভাবের সম্প্রসারণেও ছিল চীনের আপত্তি।
দ্বন্দ্বের এ ধারা একালে শেষ হলেও এর অন্তর্নিহিত জের মেটেনি, আদৌ মিটবে কি না সন্দেহের বিষয়, বিশেষ করে ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে। আমাদের আদর্শিক পরনির্ভরতা এমনই, যা এককথায় মননশীলতার খরার প্রতীক। পঞ্চাশের দশক থেকে সূচিত এ দ্বন্দ্বের শক্তিমান প্রকাশ ছিল বিশ্বব্যাপী। সেখানে চীনা নীতি আদর্শ বিচারে কয়েক পা এগিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায়।
তার নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে প্রশ্নের মধ্যেও তখনকার সোভিয়েত শাসন বিশ্বে তার প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরাশক্তিসুলভ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। নিজস্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করেও চলেছে তার মহাকাশবিজ্ঞান প্রযুক্তি গবেষণা ও তারকাযুদ্ধের মহড়া ওয়াশিংটনের পাশাপাশি। ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের অর্থনৈতিক উন্নতির তুলনায় আধিপত্যবাদী লড়াই বড় হয়ে উঠেছিল। হয়তো তাই তাদের সমাজজীবনে, ব্যক্তিজীবনে অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। শাসনযন্ত্র সেসব আমলে নেওয়া প্রয়োজন বোধ করেনি। এ ছাড়া নীতিগত ও শাসনগত একাধিক কারণ মিলে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত শাসনব্যবস্থার পতন, ইউনিয়নে ভাঙন এবং দুর্বল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নব্য রাশিয়ার আবির্ভাব। সমাজতন্ত্রী ভাবাদর্শের দুর্বল অবশিষ্ট শক্তির প্রতিবাদে শ্রমিক-জনতার সমর্থন ছিল সামান্য। তাই তাদের হার।
পঞ্চাশের দশকে সমাজতন্ত্রী ভাবাদর্শের বিশ্বব্যাপী প্রবলতার মধ্যে চীনা ধারার প্রভাব ছিল অধিকতর। পিকিং বেতার মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও তার ‘পদলেহী কুকুরদের’ সমালোচনায় এ সময় ছিল তিক্ত ও সরব। মাওবাদী চিন্তাধারায় বিশ্ব তারুণ্য উদ্বেল। এমনকি উদ্বেল ভারতীয় সমাজতন্ত্রীদের একাংশ। এ ক্ষেত্রে আদর্শগত দ্বন্দ্ব কেন্দ্রীভূত হতে থাকে যতটা মার্কিন পুঁজিবাদ-সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একই ধারায় দ্বন্দ্ব মস্কো বনাম চীন, তথা মস্কোবাদী সমাজতন্ত্র বনাম মাওবাদী জনগণতন্ত্র নিয়ে। আদর্শবাদী অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকাশ্যে আসে সমাজতন্ত্রী ভুবনে প্রভাব প্রতিযোগিতায় এবং অন্যদিকে সীমান্ত সংঘাতের মহড়ায়। মার্ক্সবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি মর্মাহত। ক্ষেত্র বিশেষে সংকীর্ণতা তাদেরও কাউকে কাউকে গ্রাস করে।
এ কথাও অস্বীকার করা কঠিন যে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাষ্ট্র গঠনে, পরবর্তী সমাজ গঠনে যেমন মূল নেতৃত্বে ছিল চিন্তার ভিন্নতা, তেমনি ছিল চীনেও অপ্রকাশ্যেÑপরে প্রচ্ছন্ন ধারায়। সংগ্রাম চলাকালে যা থাকে সুপ্ত, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তা ধীরে-সুস্থে হলেও অনুকূল বাতাসে বিকশিত হতে থাকেÑসংগ্রামীদের মধ্য থেকে পরে প্রজন্মান্তরে তার প্রকাশ।
যেমন লেনিন বনাম প্লেখানভ, স্তালিন বনাম ট্রটস্কি কিংবা বুখাবিন, জিনোভিয়েভ প্রমুখ। এমনকি ক্রুশ্চেভ। তেমনি মাও এবং চৌ কি একই ধারায় ভাবতেন নীতি ও কৌশলের ক্ষেত্রে, সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে কিংবা চুতে ও লিউ শাও চি? রাষ্ট্রশক্তি ও সমাজশক্তি গঠনের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময় দেং জিয়াও পিং তো একেবারে ভিন্ন ডালের বাসিন্দা।
চীনা রাষ্ট্রকে আপন স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বে শক্তিমান করে তুলতে হবে, প্রয়োজন হলে আদর্শবাদী সংস্কারে। সেখানে জাত্যভিমান (সোভিনিজম) নেপথ্যে কাজ করে তো করুক (এমন বিশ্বাস কি ছিল না রুশি বা চীনা ক্ষেত্রে?)। সর্বোপরি শক্তির উৎস যতটা জনগণ, বিশেষ স্থানকালে তা আসলে অর্থ ও অস্ত্রÑঅর্থশক্তিরই প্রাধান্য। প্রাক নব্বই পর্বে সোভিয়েত নেতৃত্ব যদি সমরাস্ত্র শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে তো একই সময়ে চীন অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে অর্থশক্তিকেÑ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ এমন ধারণাকে। তাই চীনে গড়ে উঠতে পেরেছে নেতৃতান্তরে কমিউনিস্ট শাসনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশ, বিশ্ববাণিজ্যে প্রাধান্য ও শক্তির সঞ্চয়।
আরো একটি চীনা নীতি এই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকরÑযথাসম্ভব রাষ্ট্রিক সংঘাত পরিহার, আদর্শিক সৌভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রে আপন রাষ্ট্রিক স্বার্থনির্ভরতা। নিজেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখা মূল লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে। সেই লক্ষ্য বিশ্বে প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শক্তি হয়ে ওঠা। তাতে যদি মৌল রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আপোশ করতে হয় তাও সই। না-ই বা অর্জিত হলো মাও-চিন্তার নতুন মানুষ, আদর্শ মানুষ গড়ার লক্ষ্য। সেটা পরে বিবেচ্য।
চীনা বিদেশনীতি এমনই এক নিজস্ব ধারায় বিকশিত হওয়ার কারণে তার রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে আপসবাদী ধারা সঞ্চারিত হতে পেরেছে। যেকোনো মূল্যে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক শক্তি অর্জন যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে সেখানে সুবিধাবাদেরও অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। ঘটেছেও। সংক্ষিপ্তভাবে বলতে হয়, তা না হলে চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পিং পং কূটনীতি সম্ভব কিভাবে, তাও আবার পাকিস্তানি দৌত্যে। শত্রুর শত্রু মিত্রÑমতাদর্শ সেখানে বিবেচ্য নয়। তাই মার্কিন-চীনা মৈত্রী। ভিন্ন নিরিখে একদা ছিল ‘হিন্দি-চীনা ভাই ভাই’Ñসীমান্ত বিতর্কে যার মৃত্যু।

দুই.
সা¤্রাজ্যবাদী ও কট্টর কমিউনিজমবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনা কূটনীতির এই মৈত্রী উদারনৈতিক বিশ্বের জন্য পরম বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবু চলেছে পক্ষ বিশেষে যুক্তিতর্কের সাফাই। অন্য পক্ষে প্রশ্ন : একটি সমাজতন্ত্রী দেশ, যতই বিভ্রান্ত হোক একটি পুঁজিবাদী, আধিপত্যবাদী দেশের তুলনায় নিকৃষ্ট হতে পারে? নাকি গোটা বিষয়টিই বৈশ্বিক ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠার লড়াই?
সমাজতন্ত্রী বিশ্বের ওই অবাঞ্ছিত বিভাজন, তবু তাদের বোধোদয় ঘটায়নি। চীন তার নিজস্ব পথ ধরেই চলেছে। এশিয়ায় তার সবচেয়ে বড় শত্রু ভারত, সীমান্তবিরোধ নিয়ে, পাকিস্তানের মতো ধর্মীয় রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল দেশ তার সবচেয়ে বড় মিত্র। আসলে সিল্করুটসহ সীমান্ত স্বার্থ, বাণিজ্য স্বার্থের কাছে আদর্শের ভরাডুবি। সত্তরের দশকের পর থেকে এমন রাজনৈতিক পথ ধরেই চলেছে চীন তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসার ঘটিয়ে। আদর্শিক দিক থেকে সমমনাদের লড়াইয়ে তার অংশগ্রহণ ছিল নাÑযেমন অন্যায় ইরাক-আগ্রাসন ইঙ্গ-মার্কিনদের, চীন সে ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নীরব দর্শক। যেমন একালে সিরিয়া ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু চুপচাপ বসে থাকেনি বিশ্বমঞ্চে নীরব দর্শক হয়ে। সে তার আগ্রাসী নীতিÑ‘নতুন বিশ্ববিধান’ প্রতিষ্ঠার নীতি নিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহ তৈরি করে এগিয়ে চলেছে। নিকারাগুয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশে দেশে চলে সিআইএর গোপন তৎপরতা এবং সেই সঙ্গে আফ্রো-এশিয়ায় সম্প্রসারণ আধিপত্যবাদী লড়াকু নীতিÑইরাক-পরবর্তী লিবিয়া-সিরিয়ায় বিদ্রোহী সমর্থনে, এর আগে যেমন চলেছে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত শক্তির বিতাড়নে, পাকিস্তানে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী তালেবান শক্তির উত্থান ও প্রতিষ্ঠায় গোপন ও প্রকাশ্য সহযোগিতায়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে চীন তার সহযোগী সোভিয়েত-বিরোধিতায়।
এমন এক বিচিত্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির নেপথ্য ও সক্রিয় সমর্থনে কট্টর ইসলামি মৌলবাদী শক্তির নিষ্ঠুর প্রকাশ ও বিকাশ এক বৈশ্বিক উপদ্রব হয়ে দাঁড়ায়। এবং তা মানবিক বিশ্বেরও বিরোধী। এ অশুভ শক্তি তার জঙ্গিবাদী নিষ্ঠুরতায় তুলনাহীন; বিশ্ব এমন উদাহরণ দেখেছে শুধু ফ্যাসিস্ট শক্তির নির্মম হত্যাকা-ে।
রাজনীতির এ রক্তাক্ত ডামাডোলে পুঁজিবাদী রাশিয়া ধীরেসুস্থে আপন শক্তির বিকাশে, তার শিল্পোন্নত ও সামরিক শক্তির পুনরুত্থানে সচেষ্ট। অন্যদিকে চীন ব্যস্ত মূলত তার বাণিজ্যিক ভুবন বিস্তারে। এমন এক বৈশ্বিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে চীন-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব ততটা প্রকাশ্যে নয়; উভয়ে নিজ নিজ পথে তাদের পরাশক্তির মর্যাদা অর্জনে ব্যস্ত।
একুশ শতকে চীনা নীতির সাফল্য তাদের বিশ্ববাজার দখলের প্রতিযোগিতায়। এর আগে মার্কিন রক্ষণশীল নীতিবাগিশরা দুর্বল রাশিয়াকে নয়, চীনকেই আবার প্রধান শত্রু বিবেচনা করে চলেছে, তবে সতর্ক পদক্ষেপে। তার তাত্ত্বিক প্রকাশ বিশ্ববিধান নীতিতে এবং ‘সভ্যতার সংঘাত’ বিচারে নতুন নতুন মিত্র দেশ তৈরির মাধ্যমে চীনকে ঘিরে রাখার নীতির প্রকাশ ঘটিয়ে।
এদিক থেকে একুশ শতকে তাদের সর্বশেষ সাফল্য ভারত ও মিয়ানমারকে রাজনৈতিকভাবে হাতের মুঠোয় এনে বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে রেখে। রাশিয়া এখন তার দুর্ভাবনা নয়, দুশ্চিন্তা চীনকে নিয়ে, চীনা পণ্যের বিশ্ববাজার দখল নিয়ে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিজয়ের রথযাত্রা অক্ষুণœœ রাখতে গিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্বে ক্রমেই পিছু হটা ও সংকটের মোকাবেলা করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষোভ যথারীতি চীনা সাফল্যের বিরুদ্ধে। চীন এখন বিশ্বে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি, সম্ভাবনার হাতছানি, এদিক থেকে এক নম্বরে উত্তীর্ণ হওয়ার।
এ অবস্থা কি মানা যায় আধিপত্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। কে চায় তার এক নম্বর অবস্থান হারাতে।

তিন.
এবার সত্যি সত্যি থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে এলো যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টের বিজয় উপলক্ষে। অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দুই দফা শাসনকালে বিষয়টি নরম পন্থায় বিবেচিত হচ্ছিল, কট্টর প্রশাসনিক আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের একপাশে রেখে। আধা উন্মাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশ্নবিদ্ধ বিজয় বিশ্বের সর্ব খাতে যেন এক অশুভ শক্তির ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েল-গাজা ভূখ- পর্যন্ত। বাদ নেই বাকি বিশ্ব।
নিজ দলেও অপ্রিয় ট্রাম্পের রাজনীতি চলছে তাঁর মর্জিমাফিক। এরইমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর মতভেদ ও মনোমালিন্য, ন্যাটো নিয়ে তাঁর ভিন্নমত, জলবায়ু সম্মেলন তাঁর পছন্দসই নয়, তাঁর চলা আপন মর্জিতে।
এর আগে বহু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের জনক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার সত্যিই লাল তাস বের করলেন তাদের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের উপলক্ষ নিয়ে। গোটা বিশ্বে এখন সর্বাধিক আলোচিত বিষয় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধÑউৎস মার্কিন প্রেসিডেন্টের একতরফা সিদ্ধান্ত। চীনা পণ্যের অভিযান ঠেকাতে, বিশেষ চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক (কর) আরোপ। সারা বিশ্বে অশুভ ঘণ্টাধ্বনি। চীন কি এ আঘাত মেনে নিতে পারে? পারেনি চীন, পারার কথাও নয়।
তাই তার একই রকম প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ, পাল্টা হুমকি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার। মার্কিন পণ্যে কর আরোপ ছাড়া আর কী সে ব্যবস্থা তা স্পষ্ট করেনি চীন। এ নিয়ে চলছে আলোচনা বিশ্ব গণমাধ্যমে, সংবাদপত্রে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঘাটতির হিসাব-নিকাশে। আমরা অর্থনীতির সূক্ষ্ম কাটা-ছেঁড়ায় যাচ্ছি না। আমাদের আলোচ্য এর রাজনৈতিক তাৎপর্য, পরিপ্রেক্ষিত ও পরিণাম। কারণ অর্থনীতি তো রাজনীতিবহির্ভূত বিষয় নয়।

আমাদের প্রশ্ন : বাণিজ্য ঘাটতি তো রাতারাতি আকাশ থেকে নেমে আসেনি? ধীরেসুস্থেই ঘটেছে। সংঘাতহীন তথা শান্তিপূর্ণ প্রথাসিদ্ধ নিয়মে এর মোকাবেলায়ই তো কাম্য। নিজের ও অন্যের প্রয়োজন মেটাতে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন বাজার সন্ধান, তুলনামূলক মুনাফা হ্রাস ইত্যাদি বিরোধহীন পদ্ধতির তো অভাব নেই, বাড়তি কর আরোপের বিপরীতে। কিন্তু ট্রাম্প শান্তির পথিক নন, তিনি উগ্রবাদী, ভিন্ন মেজাজের মানুষ। তাই প্রতিরোধ নয়, আক্রমণই তাঁর পক্ষে প্রতিরোধের সর্বোৎকৃষ্ট নীতি।
স্বভাবতই ব্যক্তিটি ট্রাম্প বলেই বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে। তাদের বক্তব্য এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব পড়বে সর্বত্র, যা মোটেই কাম্য নয়। সর্বোপরি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সস্তা চীনা পণ্য ব্যবহারকারী ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, হবে আমদানিকারক কম্পানিগুলো, এমনকি চীনে রপ্তানিকারকরাও বর্ধিত চীনা কর আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে। তারা কি ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে?
একই কথা ঘটে চীনের ক্ষেত্রেও। ট্রাম্প যত তপ্তমস্তিষ্কের মানুষ হোন না কেন, মূলত ব্যবসায়ী এ মানুষটি তো ব্যবসার ভালো-মন্দ বোঝেন; দ্বিতীয়ত বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট ধীরস্থির চিন্তার মানুষ, তিনি বুঝেশুনে হিসাব-নিকাশ করেই চাল দেবেন। এই খানেই ভরসা উদ্বিগ্ন বিশ্বের। বিশ্লেষকরা এমন ভরসায়ই আছেন যে আলোচনার টেবিলে বসে যেন বিষয়টির মীমাংসা হয়Ñউগ্র চালে ও তেমন পাল্টা-চালে নয়। এমন প্রত্যাশা বিশ্বের সব শুভশক্তির।

আহমদ রফিক

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ
                                  

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু। এই শেষ চৈত্র আর পহেলা বৈশাখ নিয়ে যে উৎসব আয়োজন, তা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালির নতুন বছরের প্রথম দিন। মোঘল সম্রাট আকবর তার শাসনামলে ফসলের খাজনা তোলার সুবিধার্থে বাংলা বছরের হিসাব শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা নববর্ষ বরণ শুরু হয়। পহেলা বৈশাখ ধর্ম বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সকল সম্প্রদায়ের এক মিলনের স্মারক। 

সময় পরিক্রমায় নববর্ষ আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির জীবনের সার্বজনীন সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। বাঙালি জাতি সারাটা বছর অধীর আগ্রহে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। পহেলা বৈশাখ প্রকৃতির নিয়মে ঘুরে আসে। দেশজ সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানস গঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোন জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়। বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। মূলত বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সচেতন জাতির পরিচয় প্রকাশিত হয়, বিচিত্র সাংস্কৃতির রূপের মধ্য দিয়ে। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সেই পরিচয়বাহী। নববর্ষ মানুষকে সচেতন করে তার সাংস্কৃতিক চেতনার স্বপন্দনে। জাতীয় জীবনে বর্ষ বরণের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অর্থ নতুনকে বরণের সাগ্রহ মনোভাব। বাঙালি একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। যাদের জন্ম বঙ্গে, মাতৃভাষা বাংলা, মূলত তারাই বাঙালি। এই বাঙালির বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। বিগত বছরের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, উৎসবের স্মৃতিচারণ পরিহার করে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। বৈশাখে উৎসবে মানুষের ঢল নামে। মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। নানা ধরনের হাতের তৈরী দ্রব্য ও খাবারের মেলা যেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খন্ড খন্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারু কাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিখা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিমালা, কত না অদ্ভুত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সে মেলায়। চোখে না দেখলে যেন বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন এত সমৃদ্ধশালী। বাংলার মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিস্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে কিন্তু এসব দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। নববর্ষ বছরটির জন্যে আশার বাণী বহন করে নিয়ে আসে। তাই নববর্ষ আমাদের প্রাণে জাগায় আশার আলো ও উদ্দীপনা। এ জন্য আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ, পারসিকদের কাছে নওরোজ এবং ইংরেজদের কাছে ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ বিশেষ আনন্দময় দিবস। বাঙালি জীবনে যেমন ছিল পূণ্যাহ অনুষ্ঠান তেমনি হালখাতা অনুষ্ঠান। জমিদারি প্রথা বাতিলের সাথে পূণ্যাহ অনুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু হালখাতা অনুষ্ঠান সগৌরবে বিরাজমান। নানা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উদযাপিত হয় হালখাতা উৎসব। বিগত বছরের ধার-দেনা শোধের পর্ব শুরু হয় এই দিনে। এর মধ্যে শুধু ব্যবসায়িক লেনদেন নয় হৃদয়ের বিনিময়ও ঘটে। ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখে মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যতা বাড়ে। আজকাল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। শহরে শহরে মুক্তাঙ্গণে কবিতা পাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মসূচী পালিত হয়। ঢাকায় রমনার বটমূলে এই অনুষ্ঠান বিশেষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু নাচ-গানই নয়, বাঙালির বহুকালের অভ্যাস, পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজি খাওয়া ওখানে চালু আছে বহু বছর থেকে। বৈশাখের তথা বাংলা নববর্ষের চেতনা বাঙালির হৃদয়ে অন্তরে মিশে আছে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলা নববর্ষের ব্যবহারিক প্রয়োগ আমাদের জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা সন কিংবা বাংলা তারিখের ব্যবহার নেই বললেই চলে। বিদ্যালয়, অফিস, আদালত, ব্যাংক-বীমা, বিদেশ ভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কোন পর্যায়েই বাংলা তারিখ ব্যবহৃত হয় না। পৃথিবীর বুকে একমাত্র যে দেশের মানুষ তাদের ভাষা রক্ষার জন্যে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, যে দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালিত হয় জমজমাট পরিবেশে, আনন্দঘন উৎসবে। সে দেশেই বাংলা সন ও বাংলা তারিখ উপেক্ষিত! এই অবস্থায় পহেলা বৈশাখের চেতনা তথা বাঙালির সংস্কৃতি আমাদের আদালতসহ দেশের সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও বাংলা তারিখ ব্যবহার করা অপরিহার্য।

 

॥ লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল॥

লেখক পরিচিতি : লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল, (শিক্ষক, কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ সেবক)

প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং অবিচার...
                                  

এসএসসি পরীক্ষা বাতিল হবে কি, হবে না তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতংক এবং দেশ জুড়ে তা নিয়ে হৈ চৈ চলছে। ২/১টি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকলে, প্রশ্ন ফাঁস কে করলো? কাদের দায়িত্ব ছিলো প্রশ্ন ফাঁস রোধের? পরীক্ষা বাতিলের আগে ২০ লাখ শিক্ষার্থীই ফাঁসকৃত প্রশ্ন পরীক্ষা দিল কিনা তদন্ত কমিটিকে তা কিন্তু আগে খতিয়ে দেখতে হবে। অবশ্যই তা প্রমান করতে হবে তাঁদের। তা না হলে কার সাজা কাকে দেবেন আপনারা? সবার আগে যারা প্রশ্ন ফাঁস করেছে তাদের খুঁজে বের করুন, যারা প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যর্থ তাদের চিহিৃত করুন, সাজা দিন। কাঠের চশমা চেখে দিয়ে ওদের খোঁজলে কিন্তু হবে না। পরিস্কার দিলমনে ওদের খুঁজুন। পেয়ে যাবেন। ওদেও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। প্রশ্ন ফাঁস রোধ হবেই হবে। যারা প্রশ্ন ফাঁস করলো, যাদের কারনে প্রশ্ন ফাঁস হলো তাদের সাজা আগে না দিয়ে গুটি কয়েক ভোক্তার (শিক্ষার্থী) কারনে সকল শিক্ষার্থীদের সাজা আপনারা কিছুতেই দিতে পারেন না। এটা আইনের বরখেলাপ হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। যার ফাঁসকৃত প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়নি এর সংখ্যাই অনেক বেশি। পরীক্ষা বাতিল হওয়া অর্থই কোমলমতি শিশুদের উপর অন্যায় করা। এদের উপর অন্যায় করা হলে তা হবে রাষ্ট্রিয় অনাচার। এর জন্য শিক্ষার্থীরা, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ আইনের আশ্রয় নিলে আপনারা তখন কোথায় যাবেন?
আমাদের কপালের দোষ, তাই দেশে প্রশ্ন ফাঁস হয়। এখন বেশি বেশি হচ্ছে। রোধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের? এসএসসির পরীক্ষার আগে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের এক বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন প্রশ্ন ফাঁস হলে প্রয়োজনে ১০ বার পরীক্ষা বাতিলের কথা বললে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ফাঁসের পর ঢালাও ভাবে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক ছিলো? অন্য কেউ অপরাধ করলে, সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এর দায় কোমলমতি শিক্ষারর্থীরা কেন নেবে? প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধে গুটি কয়েক মানুষ জড়িত। এ অপরাধতো গোটা পরীক্ষারর্থীদের নয়। তবে তারা কেন শাস্তি পাবে? প্রশ্ন ফাঁস রোধ না করতে পারার দায় এড়াতে সকল শিক্ষারর্থীর পরীক্ষা বাতিল ‘উদরপিন্ডি বোধর ঘারে’ চাপানোর মতই। প্রশ্ন ফাঁস হবে, রোধ হবেনা আর যারা কষ্ট করে সারা বছর পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিলো তাদের কষ্ট জলাঞ্জলি দিয়ে পরীক্ষা বাতিল করা হলে তা হবে অত্যন্ত দু:ক্ষজনক।
প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে পারবেন না আবার পরীক্ষা বাতিল করবেন? এটা কি হয়? বিগত বছর গুলোতে আমরা কি দেখেছি? শিশু, কড়া, বুড়ু সকলের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। রোধ করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যর্থ হয়ে সকল শিক্ষারর্থীর পরীক্ষা বাতিলের মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে কোমলমতি শিক্ষারর্থী ও অভিভাবকদের হতাশ করেছে। এতে প্রকৃত শিক্ষারর্থীদের পরীক্ষা শুরুর আগেই মানুষিক চাপ তৈরি হয়েছে। এটা করা কতটা উচিৎ হবে তা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। প্রশ্ন ফাঁসের আমাদের যে অভিজ্ঞতা তাতে দেশে অনুষ্ঠিত অনেক পরীক্ষাই বাতিল করতে হবে। পরীক্ষা বাতিল নয় আগে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকান। এটা কঠিক কাজ নয়। প্রশ্ন ফাঁস ছাড়া আগে অনেক পরীক্ষা হয়েছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীদের চিহিৃত করে তাদের শাস্তির ববস্থ্যা করলে প্রশ্ন ফাঁস রোধ হবে। প্রশ্ন হলো এখন কেন এতো হরেদরে প্রশ্ন ফাঁস হয়?
প্রশ্ন ফাঁস কেন হয় এর উত্তর কিন্ত আমাদের জানা। যারা প্রশ্ন ফাঁস করে তাদেও কেউ কেউ ধরাও পরে বলে জেনেছি। ওদের সাজা কি হয়? কেন হয় না? আইন প্রয়োগ হয়না বলেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছেতো ঘটছেই। রোধ করা যাচ্ছে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলো কেন? সংশ্লিষ্টদের তাবদ হুঙ্কার, আশ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই যেন অকার্যকর মনে হচ্ছে। সব কিছুকে বৃদ্ধাগুলি দেখিয়ে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে আমরাই লজ্জা পাচ্ছি। সংশ্লিষ্টর লজ্জিত কিনা তাই এখন প্রশ্ন? বাজে একটি ঘটনা বারবার ঘটছে তাও আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে এটা কি করে সম্ভব? সংশ্লিষ্টরা কি না দেখার ভান করছেন? সবাই জানে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরাও বলছেন, যে প্রশ্ন তারা অনলাইনে পেয়েছে তার সাথে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নে পুরোপুরি মিলও আছে। সবাই দেখছেন, জানছেন কিন্তু কর্তৃপক্ষ কেন দেখছেন না? প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা এর দায় কেন নিচ্ছেন না? এমনটা চলতে থাকলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে, শিক্ষার মান বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃত শিক্ষিত জাতি থেকে বঞ্চিত হবে দেশ। আর তা দেশের জন্য ভয়ানক একটা সংবাদ।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন কোন উপসর্গ নয়। নিয়মিত ঘটনা। তবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের কথা আগে শুনিনি। এবার শিশুদের প্রশ্নপত্রও ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় বলা যায় এ ক্ষেত্রে ষোলকলা পূর্ণ হলো। প্রশ্নপত্র নিয়মিত ফাঁস হচ্ছে; রোধ হচ্ছে না কেন? সরকার জঙ্গি দমন করতে পারছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারছে, বিশ্বব্যাংকে উপেক্ষা করেই পদ্মা সেতুর মতো কঠিন কাজগুলো করতে সক্ষমতা দেখাচ্ছে সরকার। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সংশ্লিষ্টরা কি এর দায় এড়াতে পারেন? প্রাথমিক শিক্ষাসমাপনী পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। আমাদের ছাত্র জীবনেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তখন কেউ হঠাৎ প্রশ্নপত্র পেলেও অল্প সময়ে এক জায়গা হতে আরেক জায়গায় পাঠানো দুঃসাধ্য ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়েছে। কথায় আছে, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। প্রশ্নপত্র বিতরণে ভিন্নতা আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কৌশলী হতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে পরীক্ষার দিন সকালবেলা প্রশ্নপত্র ছাপানো এবং বিতরণ করা যায়। গণিত প্রশ্ন ফাঁসের পর প্রশ্ন ফাঁস রোধে পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র স্থানীয়ভাবে ছাপা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিবৃতি দিয়েছেন। বছর তিনেক আগে আমি প্রশ্ন ফাঁস রোধে আমার লেখা কলামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করেছিলাম। তখন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও এজাতীয় সুপারিশ পেশ করেন। তা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় উদ্যোগীও হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।
তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা যায়। আলোচিত সৎ এবং সাহসী মেজিস্ট্র্যাট রোকন-উ-দ্দৌলার মতো সরকারি আমলাদের এখানে কাজে লাগাতে হবে। যথা নিয়মে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্নপত্রের নমুনা কপি সংগ্রহ করা হবে। পরীক্ষার রাতে ঐসব সৎ আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল সংগৃহীত প্রশ্নপত্র থেকে বেছে বেছে নতুন প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করবেন। সেখান থেকে পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে কেন্দ্র গুলোতে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে হবে। কেন্দ্রে আধা ঘণ্টা আগে শিক্ষার্থীদেরও প্রবেশ করাতে হবে। এ সময়ে প্রিন্টারে প্রশ্ন প্রিন্ট করে পরীক্ষার হলে সর্বরাহ করতে হবে। তাতে সুফল মিলতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য একটি সেন্ট্রাল সার্ভার থাকবে। পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় সার্ভার হতে পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকা ট্যাব বা কম্পিউটারে প্রশ্ন পৌঁছে দিতে হবে। অথবা ই-মেইলেও এ কাজটি করা যায়। এক ক্লিকেই কয়েক প্রশ্ন ই-মেইল পাঠানো সম্ভব। দেশের সবচাইতে বড় পাবলিক পরীক্ষা হলো পিএসসি। এই পরীক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো ১২-১৫ কোটি টাকার মধ্যেই গড়া সম্ভব এবং শুধু পিএসসি কেন, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ যে কোনো পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান প্রশ্নপত্র ছাপা এবং পাঠানোর খরচও অনেক বেশি পড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠালে বর্তমানের তুলনায় খরচ কয়েকগুণ কম হবে তাতে সন্দেহ নাই। বর্তমানে উন্নত পৃথিবীতে পরীক্ষার গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু আছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে এদেশেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্টরা সমাধান চাইছেন কিনা?
দেশে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য দেশবাসীর কাছে বেশ স্পষ্ট হলেও পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের সে সফলতাকেই ম্লাান করে দিচ্ছে। প্রায় সব পরীক্ষাতেই এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহল চিন্তিত। আর এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য বজায় থাকবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পিএসসি, জিএসসি, এসএসসি ও সমানের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হচ্চে। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কর্ণকুহরে পানি ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না। তা যদি হতো তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়ে থাকে। একবারও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে না কেউ। ‘শর্ট সাজেশনস থেকে আসতে পারে’ এমন মন্তব্য করে শিক্ষা বিভাগ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এর আগে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যথারীতি ফল প্রকাশ করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় মেধাবীরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়াসহ মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে, মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, কী হচ্ছে এসব? শিক্ষা ক্ষেত্রে এভাবেই কি প্রতিনিয়ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটবে? এসব রোধ করা হচ্ছে না কেন? সরকার কি রোধ করতে পারছে না? আমরা এ কথা সহজভাবে মেনে নিতে রাজি নই। সরকার চাইলে সবই পারে। তবে কি সরকার এ ক্ষেত্রে আন্তরিক নয়? যদি হয় তাহলে প্রতিবারই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন। যাই বলি না কেন এ ব্যাপারে সরকার দায় এবং ব্যর্থতা এড়াতে পারে না। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে প্রশ্নপত্রের বিষয়টি বেসরকারি কোনো সংস্থার হাতে ন্যস্ত করুক। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এর দায়িত্ব দিক। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঢের দেখেছি। এখন খুব কম। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে সফল বলা চলে। এ দায়িত্বটা বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরীক্ষামূলকভাবে দেয়া যেতে পারে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ডসহ অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। কতবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো ক’জনকে এ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে? পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নাম্বার ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয় কিন্তু শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে বারবার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যস্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসপি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের পিএসসি পরীক্ষায় পশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পরিসংখ্যান বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরো বাড়বে। এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষায়। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি। কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়নি। বহু তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না।
সর্বশেষ বলবো, প্রশ্নফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা আর চলতে দেয়া যায় না। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবার মধ্যেই একটি ব্যাধি সংক্রামক আকারে বাড়ছে। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত প্রয়োজন মনে করি।


মীর আব্দুল আলীম

 

 

 

ভাষাশ্রদ্ধায় আসুন উচ্চারণ করি ‘বিজয় বাংলাদেশ’
                                  

আজ যখন নতুন প্রজন্ম ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক-শিক্ষা-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্মাণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে; তখন বাংলা ভাষাকে-স্বাধীনতাকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে ছাত্রশিবির-জামায়াত-জঙ্গী ও দেশবিরোধীচক্র। প্রয়োজনে খোলশ পাল্টে ফেলছে, প্রয়োজনে মুখোশ পড়ে নিচ্ছে; তবু বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতাকে কলুষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদেরকে পৃষ্টপোষকতা দিচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা। যারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের নেপথ্য নায়ক ছিলো। এদের পৃষ্টপোষকতায় পরিচালিত অথবা অর্থায়িত বেশ কিঠু এফএম রেডিও, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি সাপ্তাহিক, মাসিক ম্যাগাজিনগুলোও শুরু করেছে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন পরিবেশন ও প্রচারে মাঠে নেমেছে। বৃহ্নলা ভাষার জন্ম দিয়ে এরা এগিয়ে যাচ্ছে ছাত্র ও যুব সমাজকে দ্বিধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে। এমন পরিস্থিতিতে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতি সচেতন নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিনিধিকে যে- পূর্ববাংলার বাঙালি-অবাঙালি অভিজাত নেতাদের প্রায় সবাই ছিলেন উর্দুর সপক্ষে। শিক্ষিত ও ছাত্র সমাজের একটি বড় অংশও সে ভাবধারাকে সমর্থন করত। তাই ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই সমাজের এই মনোভাবের পরিবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বুকভরা সাহস আর উদ্যম নিয়ে এগিয়ে আসেন লেখকরা। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, `হুসেন শাহ, পরাগল খাঁ, ছুটি খা ও অন্যান্য বহু খান পাঠান নৃপতিগণ ইহা হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন যে রাজত্ব স্থায়ী করিতে হইলে দেশের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত। ইহা তাহারা উপলব্ধি করিয়াছিলেন বলিয়াই নিজেদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্য রচনায় উৎসাহ দিয়াছিলেন। ভাষার নিপীড়ন চালাইলে পাঠান মোগল শাসন অনেক আগেই ধ্বংস হইয়া যাইত- কয়েক শতাব্দী তার অস্তিত্ব থাকিত না। এভাবে লেখক-সাহিত্যিকদের দৃঢ়তাপূর্ণ ভূমিকা বাঙালি মানসকে তৈরি করছিল, যার কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারি একটি অসাধারণ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল তারা। আর সব শ্রেণীর সমর্থনে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো পূর্ববাংলায়।
কাজী মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের উপর রাষ্ট্রভাষারূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধুমায়িত অসন্তোষ বেশি দিন চাপা থাকতে পারে না। শীঘ্রই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হবার আশঙ্কা আছে।
আবুল মনসুর আহমদ কিভাবে দেখেছেন ভাষা প্রসঙ্গ? `বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা` প্রবন্ধে লিখেছেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি `অশিক্ষিত` ও সরকারি চাকরির অযোগ্য বনিয়া যাইবেন। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফারসির জায়গায় ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া বৃটিশ সামাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি `অশিক্ষিত` ও সরকারি কাজের `অযোগ্য` করিয়াছিল।
শুধু এখানেই শেষ নয়; আমাদের বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে লেখকরা যখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও গবেষণা শুরু করলেন; ঠিক তখনই অর্থাৎ ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলন হয়। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কবি সুফিয়া কামাল। তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, ভালোবাসুন, দেশকে ভালোবাসুন, দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসুন, আজকের দিনে আমার মতে সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক এক কথায় বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিবানদের সামনে এই ভালোবাসার মন্ত্র ছাড়া আর কোনো মন্ত্র নেই, এই ভালোবাসার শপথ ছাড়া কোনো শপথ নেই।` পূর্ববাংলাব্যাপী যে নতুন সাংস্কৃতিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটছিল, সুফিয়া কামালের ভাষণে তার ইঙ্গিত ছিল। আর তারই সূত্রতায় একুশে আমাদের জীবনে অনির্বাণ একটি প্রেরণা। এই প্রেরণায় ১৯৫২ থেকে আমাদের সংগ্রামী পথচলা। একুশ বাঙালির জাতিসত্তার জাগরণের প্রথম প্রণোদনা। একুশের প্রেরণা ১৯৭১-এ পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায়। তারই অসামান্য ফসল আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। এ আমাদের ঐতিহাসিক অর্জন।একুশ কেবল আমাদের মুখের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি, দিয়েছে দেশপ্রেমের মহান আবেগ, দিয়েছে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী জীবনবোধ, দিয়েছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে চলার প্রাণশক্তি।আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রেরণার বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারি যেন হাজার তারের এক বীণা। তাতে সৃষ্টি হয়েছে অনেক সুর, অনেক ঝংকার! একুশের বীণায় ঝংকৃত হয়েছে আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিচিত্র সুর।একুশের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে একুশের সংকলনগুলির রয়েছে অনন্য ভূমিকা। এরই প্রথম মাইলফলক হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারী। এটি প্রকাশিত হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার পরের বছর – ১৯৫৩ সালে। সংকলনটিতে প্রকাশিত হয় একুশের কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, গান ইত্যাদি। একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনের সূচিপত্র দেখলে এতে সংকলিত সাহিত্যের বৈচিত্রময় প্রকৃতি ও প্রতিবাদী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়।এই ঐতিহাসিক ও চিরভাস্বর সংকলনটি আমাদের জাতীয় সচেতনতার উদ্বোধনের প্রথম সাহিত্যিক দলিল। এর মাধ্যমে একুশের সংকলন প্রকাশের গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিল। সংকলনটি প্রকাশের পর থেকে প্রতি বছর একুশে উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে কত না সংকলন, কত না সাময়িকী। একুশে উপলক্ষে প্রতি বছর প্রকাশিত হয়েছে পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা। আমাদের সাহিত্য-সৃষ্টির ইতিহাসে এসব সংকলন ও বিশেষ সংখ্যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। শোক ও বেদনার একুশ যে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে, সৃজনের প্রেরণা হয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে এসব সংকলন ও একুশের সংখ্যার অসামান্য অবদান।একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান প্রবন্ধে তারই সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচার এ-প্রবন্ধের লক্ষ্য নয়। দুইএকুশের প্রেরণার প্রথম সাহিত্যপ্রসূন একটি কবিতা। তা লেখা হয়েছিল চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক এবং সীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক মাহবুল উল আলম চৌধুরী। একুশের ঘটনার কথা শুনে সেদিনই লিখেছিলেন সেই কবিতাটি : ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। কবিতাটি সে-রাতেই চট্টগ্রামের কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে গোপনে ছাপানো হয় এবং পরদিন লালদিঘি মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় পঠিত ও বিলি হয়। প্রকাশের পরপরই মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।একুশের ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যে কতটা বেদনার, কতটা যন্ত্রণার, কতটা ক্ষোভের, কতটা নিন্দার তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এই প্রতিবাদী কবিতাটিতে। এ-কবিতায় প্রতিশোধের আগুনের উত্তাপ নিয়ে উচ্চারিত হয়েছিল সর্বস্তরের বাঙালির দাবি :জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল সেই সব মৃতদের নামে আমি ফাঁসী দাবী করছি।যারা আমার মাতৃভাষাকে নিবর্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যেআমি ফাঁসী দাবী করছিযাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যেফাঁসী দাবী করছি যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়েক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছেসেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।এরপর বিগত ছয়টি দশক ধরে অসংখ্য সৃষ্টিতে ভরে গেছে একুশের সাহিত্যের ডালি।একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লেখা প্রথম একটি গানটি হচ্ছে : ‘ভুলব না ভুলব না এই একুশে ফেব্রুয়ারি।’ রচনা করেছিলেন ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক। একুশের অন্যতম ফসল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা অসাধারণ গান : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?’ এ-গান আমাদের সাংস্কৃতিক প্রেরণার বিকাশে উজ্জীবনীমন্ত্রের মতো প্রেরণাময়। এ-গান আজ আমাদের কাছে এক প্রতীকী তাৎপর্যে উজ্জ্বল। একুশ পালন, শহিদ স্মরণে, প্রভাতফেরিতে, শহিদ মিনারে এ-গান আমাদের প্রেরণার এক দীপ্র মশাল। এই মশালের আলোতেই পরবর্তীকালে আমরা পেয়েছি আরো অনেক দেশাত্মবোধক গান, অসংখ্য গণসংগীত। একুশের ঘটনা বাংলা কবিতায় কী ধরনের পরিবর্তন এনেছিল তা বোঝা যাবে একুশের আগে ও পরে প্রকাশিত দুটি সংকলনের কবিতা তুলনা করলে। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত নতুন কবিতা সংকলনের কবিতাগুলি ছিল স্বপ্নিল মাধুর্য ও স্নিগ্ধ প্রশান্তিতে ভরা। আর ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনের কবিতা হয়ে উঠেছিল শোকাবহ বেদনা ও ক্ষুব্ধ অঙ্গীকারে উচ্চকিত ও দৃপ্ত। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনে তিনি লেখেন :আর যেন না দেখি কার্তিকের চাঁদকিংবা পৃথিবীর কোনো হীরার সকালকোনোদিন আর যেন আমার চোখের কিনারেআকাশের প্রতিভা সন্ধ্যানদীর অভিজ্ঞানআর রাত্রির রহস্যের গাঢ় ভাষা কেঁপে না ওঠে।সৌন্দর্য-সমর্পিত কবিকণ্ঠে এভাবে প্রভাব পড়েছিল বেদনা, ক্ষোভ ও যন্ত্রণার। এভাবেই একুশের প্রেরণা বাংলা কবিতার অঙ্গনে জন্ম দিয়েছিল সমাজ-সচেতন, দায়বদ্ধ অনেক নতুন কবির, যাঁরা নারী ও নিসর্গকে নিয়ে রোমান্টিক ভাবালুতায় নিমগ্ন হওয়ার পথ থেকে সরে এলেন। তাঁরা তাঁদের কবিতায় লিখলেন রক্ত আর অশ্রম্নর কথা, শোষণ ও বঞ্চনার কথা। ভাবিত হলেন সমাজ ও মানুষ, স্বদেশ ও বিশ্বকে নিয়ে, স্বপ্ন দেখলেন মানব-মুক্তির। তাঁদের কবিতায় ফুটে উঠল স্বদেশের রক্তাক্ত ছবি। কবিতা তাঁদের হাতে হয়ে উঠল সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার।হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনে একুশের কবিতা শিরোনামে সংকলিত হয়েছিল একগুচ্ছ কবিতা। তাতে শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা সংকলিত হয়। সেসব কবিতায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল মাতৃভাষার জন্যে আবেগময় আকুলতা, শহিদদের জন্যে গভীর বেদনা, হিংস্র শাসকদের বিরুদ্ধে ক্রোধের আগুন। একুশের শোকাবহ ঘটনা কীভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে বেদনা-বিহবল করেছিল তার আভাস পাওয়া যায় ফজলে লোহানীর কবিতায় :মৃত্যুকে যারা ভয় করেনি,মৃত্যু তাদের বরণ করেছে,এ খবর গিয়ে গাঁয়ে পৌঁছেছে সবার মুখেই বজ্রশপথ :হাতুড়ি আমরা নামিয়ে নিলামকাসেত্ম-কোদাল থামিয়ে দিলামকাঁচা শহীদের স্মৃতির ভারে।একুশের মহান শহিদদের স্মৃতিতে ছাত্রজনতা বায়ান্নর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে তাৎক্ষণিকভাবে যে শহিদ মিনার গড়ে তুলেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল রাতের আঁধারে। কিন্তু ইটের মিনার ভাঙতে পারলেও বাঙালির হৃদয় জুড়ে গড়ে-ওঠা মিনার যেভাঙা যাবে না, সে-কথাই দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতায়। বাঙালির রক্ত ও অশ্রম্নমথিত আত্মদানের প্রতীক শহিদ মিনারকে তিনি অভিষিক্ত করেছেন হৃদয়-মহিমায় :স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ভয় কি বন্ধু আমরা এখনোচার কোটি পরিবারখাড়া রয়েছি তো।ৃইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরীচার কোটি পরিবার।হাসান হাফিজুর রহমান অনুভব করেছেন, ভাষার জন্যে আত্মদানের ভেতর দিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জববার দেশের মানুষের ভেতরে সজীব হয়ে উঠছে নতুন প্রাণের দীপ্তি নিয়ে :কি আশ্চর্য প্রাণ ছড়িয়েছে – একটি দিন আগেও বুঝতে পারি নি,কি আশ্চর্য দীপ্তিতে তোমার কোটি সন্তানের প্রবাহে-প্রবাহেসংক্রমিত হয়েছে –একটি দিন আগেও তো বুঝতে পারি নি দেশ আমার।শহিদের আত্মাহুতি বাঙালির জীবনে সঞ্চারিত করেছে এক অদম্য শক্তি :তাদের একজন আজ নেই;না, তারা পঞ্চাশজন আজ নেই।আর আমরা সেই অমর শহীদদের জন্যে,তাঁদের প্রিয় মুখের ভাষা বাংলার জন্যে একচাপ পাথরের মতোএক হয়ে গেছিহিমালয়ের মতো অভেদ্য বিশাল হয়ে গেছি।সিকান্দার আবু জাফর তাঁর তিমিরান্তিক (১৯৬৫) কাব্যগ্রন্থের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ কবিতায় (রচনাকাল ১৯৫৪) যুগ-যুগান্তের ইতিহাস পরিক্রমায় যেসব অবিনশ্বর স্মৃতিস্তম্ভ দেখেছেন তারই ধারাবাহিকতায় অমর স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দেখেছেন একুশেরশহিদমিনারকে :আমার কালেইতিহাসের সর্বশেষ পথের বাঁকেএসে দেখলাম :অকস্মাৎ জমাট বেঁধে যাওয়াপুঞ্জীভূত প্রতিবাদে তৈরিআর একটি স্মৃতিস্তম্ভ। চতুর্দিকে তারজমাট রক্তের পুরু আচ্ছাদন।পরিচয়হীন ফলকে লিপিবদ্ধ :‘২১শে ফেব্রুয়ারী।’পাকিস্তানি আজাদিকে যারা ‘জিন্দেগানির দূত’ হিসেবে দেখেছেন সেই পাকিস্তানের যাত্রাপথকে ‘নমরুদের পথ’ হিসেবে চিত্রিত করে পাকিস্তানবাদের বিরোধিতা করে কবিতা লেখার সূচনা করেছিলেন আবদুল গণি হাজারী (১৯২১-৭৬)। নমরুদের সেই পথ থেকে উত্তরণের প্রেরণা হিসেবে তিনি গ্রহণ করেছেন একুশের প্রেরণাকে। তাঁর সামান্য ধন (১৯৫৯) কাব্যগ্রন্থের ‘ভালোবাসি বলেই’ কবিতার অংশবিশেষ এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় :অনেক মৃত্যুকে বুকে করে আমাদের বেঁচে থাকাঅনেক ঝড়ের পীড়ন পাঁজরার তলে বরকতের মায়ের কান্না কতবার পৃথিবীর বুক চিরে কতবার নিস্তব্ধ হলো।এত মৃত্যুর কথা স্মরণ করেইআমাদের আয়ু মৃত্যুহীনআর তোমায় ভালোবাসি বলেইজীবন আমারএত সহজে প্রাণ দিয়ে যাই।ঐতিহ্য-অন্বেষী কবি হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ কবিতায় স্বদেশভূমি মাতৃচেতনার নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত :বস্তিবাসিনী মা অকস্মাৎ স্বাস্থ্যবান সন্তানকে বুকের কাছেধরতে পারলে যেমন করে আহত দিনের অসংখ্য মৃত্যুকে ভুলে থাকতে পারেতেমনি পঞ্চাশটি শহিদ ভাইয়ের অকাল মৃত্যুকে ভুলেছিমা, তোমাকে পেয়েছি বলে।আজ তো জানতে এতটুকু বাকি নেই মাগো,তুমি কি চাও, তুমি কি চাও, তুমি কি চাও(‘অমর একুশে’, বিমুখ প্রান্তর) একুশের রক্তাক্ত দিনটি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কবিতা রচনার প্রেরণা হয়ে আছে। একুশের প্রেরণা অভিব্যক্তি পায় তাঁর কবিতায় এভাবে :বাতাসের সোহাগে রাত এলো বুনো,কারা জানি ছাত্রাবাসে মারা গেছে, ‘শোনোশোনো’, তারপর গলি, ঘর, হ্যারিকেন আলোমুহূর্তের মতো চুলে হাত বুলালো,বই মেলে থেমে গিয়ে হৃদয়ের আওয়াজে,আর্তিতে হাড়-ভরা ছায়া কাঁপে লাজেচুন ওঠা দেওয়ালে,মনে মনে বলে, ‘বরকতের চোখে বুঝি ভবিষ্যৎ বুঁজে আছে।এভাবে একুশের প্রেরণা তাঁর কবিতায় ভবিষ্যৎমুখী সম্প্রসারণ পায়। দিলওয়ারের কবিতায়ও একুশের প্রেরণা অনির্বাণ :নদী ও বৃষ্টির জলে যে-দেশে শস্যেরা অফুরানদ্বৈমাতৃক সেই দেশে সাহসী একুশে অফুরান।তাঁর কবিতায় একুশে হয়ে উঠেছে মায়ের প্রতীক :মা আমার বসে আছে রাত্রির নদীর তীরে একাআমি যাবো তার কাছে। কে তুমি কঠিন বাহু মেলেআমাকে ঠেকিয়ে রাখো।(‘রাত্রির নদীর তীরে মা আমার’)একুশের প্রেরণার অন্যতম প্রধান আশ্রয় বাংলা ভাষা। কিন্তু বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে এই ভাষার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র দেখে ক্ষুব্ধ কবি শামসুর রাহমান পরবর্তীকালে লিখেছেন অসাধারণ কবিতা : ‘আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ :তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো, কী থাকে আমার?উনিশ শো বায়ান্নর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলিবুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।সে-ফুলের একটি পাপড়ি ছিন্ন হলেআমার সত্তার দিকেকত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।ৃ ৃ ৃতোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।কিন্তু তাঁর ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতায় নতুনভাবে উদ্ভাসিত হয় একুশের প্রেরণা :আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথেকেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো বাএকা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় – ফুল নয়, ওরাশহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের প্রেরণারই রঙ।সে-চেতনা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের দৃপ্ত আবেগময়তায় ভাস্বর :আবার সালাম নামে রাজপথে শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগবরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।সালামের বুকে আজ উন্মথিত মেঘনাসালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকাসালামের মুখ আজ তরুণ, শ্যামল পূর্ব বাংলা।এভাবে ভাষা-আন্দোলনের রক্ত আর অশ্রম্ন-ঝরা সংগ্রামী ইতিহাস একাত্তরের সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘আর কত রক্তের দরকার হবে’র কয়েকটি পঙ্ক্তি :মাতুই এবার নিজেই তবে বলে দেএই একটি শব্দ।উচ্চারিত এই একটি শব্দ লিখতে কতখানি রক্তের দরকার হয়?আমার এ দেহের আর কতটুকু রক্তের দরকার হবে?যখন এ শব্দ আর এই বড় রক্তাক্ত স্বদেশকেউ মুছে ফেলতে পারবে না।মা;বরকত লিখেছে – মাসালাম লিখেছে – মাজববার লিখেছে – মামতিউর-আসাদ ওরা লক্ষ লক্ষ লিখে গেছে – মা।এ-প্রসঙ্গে একুশের কবিতার আরেকটি বিশিষ্ট সংকলনের কথা উল্লেখ করতে হয়। এটি হচ্ছে বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত একুশের কবিতা। একাডেমি ১৯৮৩ সালে এটি প্রকাশ করে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত একুশ নিয়ে লেখা ১১৫ জন কবির ১৩২টি কবিতা এতে সংকলিত হয়। সংকলিত কবিতাগুলি বাংলা ও ইংরেজি – এই দুই ভাষায় প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে : জসীমউদ্দীনের ‘একুশের গান’, সুফিয়া কামালের ‘এমন আশ্চর্য দিন’, আহসান হাবীবের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, ফররুখ আহমদের ‘ভাষা আন্দোলনের নিহত আত্মার প্রতি’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, আবদুল গণি হাজারীর ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, আবুল হোসেনের ‘তোমাকে নিয়ে যত খেলা’, সানাউল হকের ‘অমর একুশে’, আবদুল লতিফের ‘একুশের গান’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘একুশের কবিতা’, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর ‘একুশের গাথা’, ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘আত্মা থেকে একটি দিন’, আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘কৃষ্ণচূড়ার মেঘ’, দিলওয়ারের ‘একুশের কবিতা’, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘একুশের কবিতা’, বেলাল চৌধুরীর ‘বর্ণমালার নিরস্ত্র সাহস’, হায়াৎ মামুদের ‘ঘুরে ফিরে ফাল্গুন’, শহীদ কাদরীর ‘একুশের স্বীকারোক্তি’, রফিক আজাদের ‘পঞ্চানন কর্মকার’, আসাদ চৌধুরীর ‘ফাল্গুন এলেই’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, মোহাম্মদ রফিকের ‘মহান একুশে’, মহাদেব সাহার ‘তোমরা কী জান’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমাকে কী মাল্য দেবে দাও’, হুমায়ুন আজাদের ‘বাংলা ভাষা’, আবুল হাসানের ‘মাতৃভাষা’, মাহবুব সাদিকের ‘অবিনাশী বাংলা’, আবুল মোমেনের ‘আমি কি ভুলিতে পারি’, অসীম সাহার ‘মধ্যরাতের প্রতিধ্বনি’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘মাতৃভাষা’ ইত্যাদি। একুশ-পরবর্তী অর্ধশত বছরে এদেশের কবিদের সত্তায় প্রবহমান একুশের প্রেরণার প্রতিফলন ঘটেছে এসব কবিতায়। তিনএকুশের গল্প-রচনার সূত্রপাত হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারীকে কেন্দ্র করে। এ-সংকলনে প্রকাশিত একুশের গল্পগুলি হচ্ছে : শওকত ওসমানের ‘মৌন নয়’, সাইয়িদ আতীকুল্লাহর ‘হাসি’, আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি’, সিরাজুল ইসলামের ‘পলিমাটি’, আতোয়ার রহমানের ‘অগ্নিবাক’।শওকত ওসমানের ‘মৌন নয়’ গল্পটি ভাষা-আন্দোলন নিয়ে লেখা প্রথম একুশের গল্প। একুশের প্রথম কবিতার মতো এটি লেখা হয় চট্টগ্রামে। গল্পটি যেমন চলচ্চিত্রধর্মী, তেমন নাটকীয়। গল্পে একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার রূপক উপস্থাপন করেছেন লেখক। একটি চলন্ত বাসের সমস্ত যাত্রীর নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে একুশের মর্মান্তিক শোকাবহ ঘটনার মানস প্রতিক্রিয়াকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ-গল্পে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পুত্রশোকে স্তব্ধ এক বৃদ্ধ যাত্রী। কিন্তু এক সময় পুত্রশোককাতর বৃদ্ধ পিতার আর্তনাদে সে-স্তব্ধতা খান-খান হয়ে ভেঙে যায় : ‘কী দোষ করেছিল আমার ছেলে? ওরা কেন তাকে গুলি করে মারল?’ সব যাত্রী এমনকি ড্রাইভারও তার দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধের ক্ষোভ নিমেষেই সঞ্চারিত হয় সবার মধ্যে।সাইয়িদ আতীকুল্লাহর ‘হাসি’ গল্পে দেখা যায়, আবুভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় হলে আবুর নীহার খালাও তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি চললে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে আবুও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তার লাশ বাসায় আনা হলে প্রচ- শোকে নীহার খালা ভেঙে পড়েন।আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি’ গল্পে একুশে ফেব্রুয়ারির হৃদয়বিদারক ঘটনা চিত্রিত হয়েছে একটি দরিদ্র পরিবারকে ঘিরে। পেনশনভোগী কেরানি সাদত সাহেবের চশমা ভেঙে গেলেও অভাবের কারণে নতুন চশমা কেনা হয় না। তাঁর চাকরিজীবী পুত্র আসাদ একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে যোগ দিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হলে পরিবারটিতে বিপর্যয় নেমে আসে। বৃদ্ধ কেরানি অন্ধদৃষ্টিতে মনে-মনে আঁকেন আসাদের জন্ম-আসন্ন সন্তানের ছবি।আতোয়ার রহমানের ‘অগ্নিবাক’ গল্পের নায়ক মনি।দেশবিভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখে বাবা, মা, ভাই-বোনের সঙ্গে মনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে আসে ঢাকায়। এখানে স্থিতু হতে না হতেই শুরু হয় ভাষা-আন্দোলন। মনি সে-আন্দোলনে যোগ দেয় এবং পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়।একুশের গল্পের প্রথম ও একমাত্র উল্লেখযোগ্য সংকলন রশীদ হায়দার-সম্পাদিত একুশের গল্প। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এতে একুশ নিয়ে লেখা তিন দশকের প্রতিনিধিত্বশীল কিছু গল্প স্থান পায়। হাসান হাফিজুর রহমান-সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনে অন্তর্ভুক্ত সাইয়িদ আতীকুল্লাহর ‘হাসি’ গল্পটি ছাড়া অন্য গল্পগুলি অন্তর্ভুক্ত হয় এতে। এর বাইরে এই নতুন গল্পগুলি এতে স্থান পায় : সত্যেন সেনের ‘ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রামী’, রণেশ দাশগুপ্তের ‘কাঁথা সেলাই হইছে নিশ্চিন্ত’, অজিতকুমার গুহের ‘বুলু’, সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘খরস্রোত’, মির্জা আবদুল হাইয়ের ‘আমরা ফুল দিতে যাব’, আবু ইসহাকের ‘প-শ্রম’, শহীদুল্লা কায়সারের ‘এমনি করেই গড়ে উঠবে’, মঈদ-উররহমানের ‘সিঁড়ি’, আনিস চৌধুরীর ‘চেতনার চোখ’, মিন্নাত আলীর‘রুম বদলের ইতিকথা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘হস্তান্তর’, মুর্তজা বশীরের ‘কয়েকটি রজনীগন্ধা’, মাফরুহা চৌধুরীর ‘সেদিনের এক লগ্ন’, শহীদ আকন্দের ‘যখন পারি না’, জহির রায়হানের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘সম্রাট’, রাবেয়া খাতুনের ‘প্রথম বধ্যভূমি’, রশীদ আল হেলালের ‘বরকত যখন জানত না সে শহিদ হবে’, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘আমি খুনি হতে চাই না’, শওকত আলীর ‘অবেলায় পুনর্বার’, রাজিয়া খানের ‘শহীদ মিনার’, আবুল হাসানাতের ‘আরও কিছু রক্ত’, নূর-উল আলমের ‘একালের রূপকথা’, মকবুলা মনজুরের ‘শপথের সূর্য’, খালেদা এদিব চৌধুরীর ‘বাইশ বছর পরে’, রিজিয়া রহমানের ‘জ্যোৎস্নার পোস্টার’, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘স্মৃতিময়’, মাহমুদুল হকের ‘ছেঁড়া তার’, আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘দাগ’, রশীদ হায়দারের ‘সুদূরের শহীদ’, জুলফিকার মতিনের ‘জাতিস্মরেরা’, হরিপদ দত্তের ‘তার ফিরে আসা’, সেলিনা হোসেনের ‘ফিরে দেখা’, হারুন হাবিবের ‘শিকড়’, পূরবী বসুর ‘মায়ের দ্বিতীয় বিবাহ’, তাপস মজুমদারের ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্পর্কিত একটি গল্পকরী খসড়া-সম্পর্ক : ১৯৫২-২০৫২’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘সংকোচ’ এবং আহমদ বশীরের ‘উনিশ শ তিয়াত্তরের একটি সকাল’, মইনুল আহসান সাবেরের ‘মরে যাওয়ার সময় হয়েছে’। এসব গল্পের কয়েকটি সম্পর্কে সংক্ষিপে আলোকপাত করছি।সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘খরস্রোত’ গল্পে ১৯৫০-এর দশকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা-আন্দোলনের যে-প্রভাব পড়েছিল সে-দিকটি ফুটে উঠেছে। অবসরপ্রাপ্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছেলে মুনিরের জন্যে চাকরি ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু সে ব্যস্ত একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্ত্ততি নিয়ে। এজন্যে তার ওপর অসন্তুষ্ট তিনি। তিনি ছেলেকে বাইরে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু মুনির জানায়, দেশের জন্যে তার কিছু করার আছে। সেদিন সে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। এভাবে বাংলা ভাষার আন্দোলনের কথা বারবার উঠে এসেছে কবিতায়-গল্পে-উপন্যাসে। সেই সাথে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত নতুন কবিতা সংকলনে শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, চাঁদ ফুল পাখি মেঘ নক্ষত্র শিশির আর নারীর প্রণয় আজো মিথ্যা নয়।’ মিথ্যে নয় বলেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলা ভাষা বিকৃতিরোধ করার মহান লক্ষ্যে। এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে চির অমর করে রাখতে সকল শ্লোগানে ‘বাংলাদেশ’ নামটির প্রতি সর্বোচ্চ চেষ্টার মধ্য দিয়ে উচ্চারণ করতে। পাশাপাশি যতদূর সম্ভব বাংলাদেশে উর্দু শ্লোগান না দেয়ার চেষ্টাটি আমাদেরকেই করতে হবে। উপরে অনেক কথা বলেছি, আর তাই সেই কথাগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলতে চাই- শুধু একুশ এলেই নয়; সারা বছর ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ অথবা ‘জয় বাংলা’ না বলে চলুন বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান রেখে ‘বিজয়’ আর ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ভূখন্ডের প্রতি সম্মান রেখে ‘বাংলাদেশ’ উচ্চারণ করি। যার ঐক্যবদ্ধতায় আমাদের বায়ান্ন ও একাত্তর গর্বিত থাকবে ‘বিজয় বাংলাদেশ’ শ্লোগানের মধ্য দিয়ে...
মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

চার বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ
                                  

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের চতুর্থ বছর পূর্তি হলো ১২ জানুয়ারি। গত চার বছরকে বর্ণনা করা যায় উন্নয়ন, অগ্রগতি, অর্জন আর সাফল্যের ধারাবাহিকতার সময় হিসেবে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত্ম ছিল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার উদ্যোগে বাংলাদেশের মানবিক অবস্থান দেখেছে সারাবিশ্ব্ব। সরকারের এই মেয়াদে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ।
কঠিন এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার চার বছর পূর্ণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সরকারের ধারাবাহিক দ্বিতীয় মেয়াদের এই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ পাওয়া বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজ দেশের নাগরিক ছাড়াও বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র এবং সুচিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে বাংলাদেশ। বিশেস্নষকদের মতে এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে।
বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি নিশ্চয়তা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়ন আন্ত্মর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত নয় বছরে দেশ অবকাঠামো, আর্থ-সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এ সময় মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হয়েছে, মেগা প্রকল্পগুলো বাস্ত্মবায়নের কাজ অব্যাহতভাবে এগিয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.৫৭ থেকে ৭.২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮৪৩ থেকে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, বিনিয়োগ ২৬.২৫ শতাংশ থেকে ৩০.২৭ শতাংশ, রপ্তানি ১৬.২৩ থেকে ৩৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্স ১০.৯৯ থেকে ১২.৭৭ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ১০.৭৫ থেকে ৩৩.৪১ বিলিয়ন ডলার এবং এডিপি ২৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন টাকা।
দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেয়ার ঘটনায় অনেক দেশ ও সংস্থা সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সেপ্রেসওয়েসহ আরও কিছু বড় প্রকল্প বাস্ত্মবায়ন করছে সরকার। ফেনী জেলার মহিপালে দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে।
১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও চলমান। রয়েছে মহাকাশ জয়ের লক্ষ্যও। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট `বঙ্গবন্ধু-১` আগামি মার্চে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উপগ্রহ সফলভাবে মহাকাশে স্থাপিত হলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। বছরে সাশ্রয় হবে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কূটনৈতিক সাফল্যেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। কোনোরকম যুদ্ধ-সংঘাত বা বৈরিতা ছাড়াই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত্ম মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে স্থল সীমান্ত্ম চুক্তি হয়েছিল তা বাস্ত্মবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করাও বাংলাদেশের বড় অর্জন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আন্ত্মর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও সংস্থা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করে পাশে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়েছেন `মাদার অফ হিউম্যানিটি` উপাধি। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবেলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে `নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট` বা `পূর্বের নতুন তারকা` হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বৈশ্বিক রাজনীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা `পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস` বিশ্বের পাঁচজন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে চিহ্নিত করেছে, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই এবং উলেস্নখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকার প্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় বিভিন্ন আন্ত্মর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো তাকে `শান্ত্মিবৃক্ষ` ও ২০১৫ সালে ওমেন ইন পার্লামেন্টস গ্রোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গেস্নাবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্ত্মর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার `চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫` পুরস্কারে ভূষিত করে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতায় বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও গোষ্ঠীর চাপ সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচার শেষে রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই বিচার স্বাধীন বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য।
গত চার বছরে অনেক সফলতা এলেও এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। এই সময়ে পিছু ছাড়েনি ষড়যন্ত্র। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার পরেও নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে জঙ্গিবাদ। তবে সব ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জ প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবেলা করেই পথ চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছরপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের উন্নয়নের সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন।
এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা। যে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

 

মোতাহার হোসেন: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

শিক্ষা ধ্বংসে বইয়ের বোঝা-সৃজনশীল এবং ফাঁসতন্ত্র
                                  

প্রশ্নফাঁস তদন্তে দুই কমিটি গঠন করেছে হাইকোর্ট। সারাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী-জঙ্গী-জামাত-শিবির চক্রের পাশাপাশি সন্ত্রাসী-দানবীয় দুর্নীতিবাজ চক্রের সমন্বয়ে অসংখ্যবার রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্যায়ের যে স্বর্গরাজ্য বানানো হয়েছে; সেই স্বর্গরাজ্য ধ্বংস করার এই সামাণ্য প্রয়াসে অন্তত আদালত এগিয়ে আসায় অন্তত কিছুটা আনন্দিত হওয়ার সুযোগ গড়ে উঠেছে প্রকৃত দেশ-মানুষ-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজকর্মীদের।
অতিতের প্রায় ৭৫ বার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও চলতি বছর এসে কেবলমাত্র ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত করতে বিচার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক দুটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। অধ্যাপক কায়কোবাদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রশাসনিক কমিটি এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের বেঞ্চ এ কমিটি গঠন করে দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেনব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মনিরুজ্জামান। অবশ্য এর আগে সকালে একই বেঞ্চ এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গণকে কলুষমুক্ত করতে দুই সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয় শিক্ষা সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, আইন সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং উইংয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, তথ্যপ্রযুক্তি সচিব, বিটিআরসির সচিব-চেয়ারম্যান, বিটিসিএলপ্রধান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক-চেয়ারম্যান, ঢাকা-রাজশাহী, কুমিল্লা-যশোর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে।
এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে দিনদিন-ই শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে। আর এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলার ব্যাপারে উন্নত বিশ্বে এবং ধর্মীয়ভাবেও বলা হয়েছে- যখন কোন জাতির শিক্ষা দূর্বল হয়ে যায়; তখন সেই জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। আর আশ্চর্য জনক হলেও সত্য যে, এই রাস্তাতেই হাঁটছে ‘উদ্বোধন’ বানান লিখতেও ভুলকারী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। আর তার জন্য নিতান্তই এটা কোন বিষয় না বলেই ধারণা করছি। এর উপরে আবার প্রশ্নফাঁসের দায়মুক্তি চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়! গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ কারণে ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে দেশের চলমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ সময় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় মেনে নিলে বিরোধী দলগুলো এ ইস্যুতে আন্দোলন চাঙ্গা করার পাশাপাশি নানামুখী সমালোচনার সুযোগ পাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে দেশে শিক্ষা নিয়ে চলছে একের পর এক ষড়যন্ত্র। যেভাবে বাংলাদেশ স্বাধীান হওয়ার আগেই আবদুল মালেক নামক কুলাঙ্গার রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংশ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলো। আর এখন মালেকের প্রেতাত্মারা উঠে পড়ে লেগেছে। এই সুযোগে হাজারো কাহিনীর জন্ম হচ্ছে-ধ্বংশ হচ্ছে ছাত্র জীবন-শিক্ষা জীবন। তবু বসে নেই কেউ; চলছে গলাবাজী। যেভাবে প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ মিললে পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ঘোষণার পর এ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবে এর পুরোটাই লোক দেখানো একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কার্যত কোনো পরীক্ষা বাতিল করার সামান্য ইচ্ছাও সংশিস্নষ্ট মন্ত্রণালয়ের নেই। বরং এর মাধ্যমে তারা তাদের ঘাড়ে চেপে বসা প্রশ্নফাঁসের দায় এড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি এসব প্রশ্নফাঁস হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ততটা ক্ষতি হয়নি, মূল্যায়ন কমিটির কাছ থেকে এ সংক্রান্ত বক্তব্য সংগ্রহ করাই এর মূল লক্ষ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
বইয়ের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত নতুন প্রজন্মের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিলো সৃজনশীল পদ্ধতি। আর এখন বলা হচ্ছে- পাঁচ কারণে ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে দেশের চলমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ সময় সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় মেনে নিলে বিরোধী দলগুলো এ ইস্যুতে আন্দোলন চাঙ্গা করার পাশাপাশি নানামুখী সমালোচনার সুযোগ পাবে। এতে সংশিস্নষ্ট প্রশাসনের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার চিত্র জনসম্মুখে উন্মোচিত হবে। যা সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবে। অন্যদিকে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে তা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষা নেয়া হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের ফুঁসে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি তাদের সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষও যোগ দিতে পারে। তৃতীয়ত, পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধেও সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এ অবস্থায় তারা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠবে। চতুর্থত, এখন পর্যন্ত সরকার প্রশ্নফাঁসকারী চক্রের মূল হোতাদের কারও টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। এমনকি তারা কোন কৌশলে, কোথা থেকে কীভাবে প্রশ্নফাঁস করছে তাও গোয়েন্দাদের এখনও অজানা। এ ছাড়া প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে এ চক্রের গডফাদারদের সম্পর্কে কোনো ক্লু পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। তাই প্রশ্নফাঁস রোধে গোয়েন্দারাও কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
এমন একটা অকমর্ণ পরিবেশ শিক্ষাখাতে তৈরি হয়েছে যে, পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি এবং খাতা দেখা শেষে ফল প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত সময়ও এখন শিক্ষকদের হাতে নেই। কেননা এরই মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আগামী ২ এপ্রিল থেকে শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পুনঃপরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করা হলে হ-য-ব-র-ল দশা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া নতুন করে আরও কোনো সংকট তৈরি হতে পারে বলেও সরকার আশঙ্কা করছে। তাই সংশিস্নষ্ট প্রশাসন কিছুটা সমালোচনা গায়ে মেখেই ঝুঁকি এড়াতে চাইছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে থাকার পরও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বং করতে করতে উম্মাদপ্রায় চক্রটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া পরীক্ষা বাতিল না করার ব্যাপারে এরই মধ্যে তারা গ্রিণ সিগন্যাল পেয়েছে। এখন এ ব্যাপারে দায়মুক্তির সনদ তৈরির পথ খোঁজা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রশ্নফাঁস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ না থাকায় তা মেনে নিয়েই মূল্যায়ন কমিটি প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও তা পরীক্ষা শুরুর মাত্র ১৫/২০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদের হাতে পাওয়ায় তা থেকে তারা বিশেষভাবে উপকৃত হয়নি, এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ফাঁসকৃত প্রশ্ন পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার হলেও মোট পরীক্ষার্থী ২০ লাখেরও বেশি, তাই পুনঃপরীক্ষা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই, এমন সুপারিশ করার কথাও ভাবছে মূল্যায়ন কমিটি। যদিও সংশ্লিষ্টদের কেউ এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কমিটির সদস্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার অবশ্য গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। তদন্ত কাজ শেষ হলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মূল্যায়ণ কমিটির প্রধান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর বলেন, `পত্রপত্রিকায় যেসব তথ্য এসেছে আমরা সেগুলো বিশেস্নষণ করব। প্রতিটি পরীক্ষাকে আমরা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করব। কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন আসলে ফাঁস হয়েছে আর কোনগুলো ফাঁস হয়নি সেসব বিষয়ে আমাদের আলাদা মূল্যায়ন থাকবে। কোনো পরীক্ষা বাতিল হবে কিনা সে বিষয়ে আমরা সুপারিশ করব। তবে সেটা বাস্তবায়ন করবে মন্ত্রণালয়।` কিন্তু শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলছেন ভিন্ন কথা। পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত আপাতত তাদের নেই। কারণ এতে তারা বড় কোনো লাভ দেখছেন না। এ ছাড়া বেশ ক`জন প্রশ্নফাঁসকারী ধরা পড়ছে। অচিরেই এদের পুরো সিন্ডিকেট ধরা যাবে। তাই পুনঃপরীক্ষা নেয়া ততটা জরুরি নয়- অভিমত প্রতিমন্ত্রীর। তার উপর মরার উপর খড়ার ঘায়ের মত পরীক্ষা শুরুর এক সপ্তাহ আগে সচিবালয়ে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির এক বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিলের জোরাল হুঁশিয়ারি জানালেও এ ব্যাপারে তিনি এখন কিছু বলছেন না। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসেনের সুরও এখন অনেকটাই নরম।
আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন মূল্যায়ন কমিটি ও পুনঃপরীক্ষার ব্যাপারে কোনো ধরনের কথা না বলে প্রশ্নফাঁস রোধে নানা পরিকল্পনার ছক প্রকাশ করছেন। শিক্ষাবিদদের ভাষ্য, অতীতেও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সে ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নতুন করে নানা ছক আঁটা হয়েছে। এবারও তা-ই হচ্ছে। এমনিতেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে। এর ওপর প্রশ্নফাঁস রোধে শিক্ষা প্রশাসনের ব্যর্থতার খড়গ যেভাবে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা চলছে তাতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে গভীর শঙ্কা রয়েছে। প্রশ্নফাঁস হয়েছে তা প্রমাণিত হলে পরীক্ষা বাতিল করা হলে তা `উদোর পি-ি বুঁদোর ঘাড়ে` চাপানোর নামান্তর। কেননা পরীক্ষার্থীরা মেধা-ঘাম ঝরিয়ে যে পরীক্ষা দিয়েছে তা বাতিল হলে শিক্ষার্থীদের ফের একই কষ্ট করতে হবে। পুনঃপরীক্ষায় এক প্রশ্ন দ্বিতীয়বার আসার সম্ভাবনা কম থাকায় পরীক্ষার্থীরা নতুন করে `কমন প্রশ্ন` খুঁজবে। তাতে করে আরো দ্রুত ভেঙ্গে পড়বে শিক্ষার ভিত্তি। এই ভিত্তি ভেঙ্গে দিতে বিদেশী ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি সচল হচ্ছে দেশীয় ষড়যন্ত্রও। আসুন প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হই। বাঁচাই শিক্ষা বাঁচাই দেশ। তা না হলে হয়তো এমন সংবাদ আরো পড়তে হবে - ‘জয়পুরহাট শহরের সোনার পট্রি (বাজার গলি) সড়কের ওপর থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ইংরাজী ১ম পত্রের ২৫টি উত্তরপত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে ওই উত্তরপত্রগুলো মূল্যায়নের জন্য জয়পুরহাটে আনার সময় অসর্তক মুহুর্তে বস্তার মুখ খুলে রিক্সা থেকে সড়কের ওপরে পড়ে গিয়েছিল। আরও ৫০টি উত্তরপত্রের এখনও হদিস মিলেনি, খোঁজাখুজি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।’
প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মের প্রতিটি প্রতিনিধিকে কালোর বিরুদ্ধে আলোর মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে ভালোবেসে। যে আলোর মিছিল থেকে শাদাকে শাদা এবং কালোকে কালো বলার সাহসে সাহসীদের সংখ্যা থাকেব শতকরা ৯৯ জন। যে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি থাকবে ভালোবাসা-বিশ্বাস দেশের জন্য-মানুষের জন্য। নিরন্তর এগিয়ে চলায় আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলেই রক্ষা করা সম্ভব বাংলাদেশে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি আর সমাজের অবক্ষয়। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গণ নীতিমালা প্রণয়ন; একমূখি শিক্ষা ব্যবস্থা কমিশন গঠন নিরন্তর প্রয়োজন। একমূখি শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলে আর আরবী বা তথাকথিত ইংলিশ নিয়ে যেমন বাড়াবাড়াবাড়ি তৈরি হবে না; তেমনি বন্ধ হবে বিকৃত এই শিক্ষার পরিবেশ; এগিয়েই যাবে বাংলাদেশ...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

 


   Page 1 of 5
     উপসম্পাদকীয়
রাজনীতির হঠাৎ হাওয়ার চমক
.............................................................................................
রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে
.............................................................................................
ওজোনস্তরের নতুন দুঃসংবাদ
.............................................................................................
বিজ্ঞান গবেষণা ও বাংলাদেশ
.............................................................................................
বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চাই
.............................................................................................
চীনা ‘ইউয়ান’, ভারতীয় ‘রুপী’, তুর্কী ‘লিরা’ সবার দাম কমছে
.............................................................................................
এখনো নিয়মিত মৃত্যু সড়কে কে দায় নেবে
.............................................................................................
মাঠের লড়াইয়ে লক্ষ্য হোক জয়
.............................................................................................
একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশায়
.............................................................................................
আর কত রক্ত ঝড়বে জাতির বিবেকের?
.............................................................................................
হুমকিতে নয়, আলোচনায়ই সমাধান
.............................................................................................
বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ
.............................................................................................
প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং অবিচার...
.............................................................................................
ভাষাশ্রদ্ধায় আসুন উচ্চারণ করি ‘বিজয় বাংলাদেশ’
.............................................................................................
চার বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ
.............................................................................................
শিক্ষা ধ্বংসে বইয়ের বোঝা-সৃজনশীল এবং ফাঁসতন্ত্র
.............................................................................................
প্রশ্নফাঁস আর কোচিংবাণিজ্যে শিক্ষার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
.............................................................................................
প্রশ্ন ফাঁসের দায় কে নেবে?
.............................................................................................
মায়ের ভাষার অবহেলা কেন করছি আমরা?
.............................................................................................
সবাই জেগে উঠুক ভেজালের বিরুদ্ধে
.............................................................................................
নির্বাচন কমিশনের কর্মক্ষমতা ও ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
.............................................................................................
প্রশ্ন ফাঁস ও শিক্ষার দৈন্যদশা রোধ সম্ভব
.............................................................................................
মশা আর মাছি ধুলার সঙ্গে বেশ আছি!
.............................................................................................
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বাড়াতে হবে
.............................................................................................
প্যারাডাইস পেপার্স : সারাবিশ্বে সমস্যা ও সমাধান
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধুর অগ্নিগর্ভ ভাষণ : ইউনেস্কোর স্বীকৃতি
.............................................................................................
রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পূনর্বাসনে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী
.............................................................................................
নিরাপদ পথ দিবস চাই
.............................................................................................
রোহিঙ্গা গণযুদ্ধের সূচনা হোক, স্বাধীন হোক আরকান
.............................................................................................
দর্শনহীন শিক্ষার ফল ব্লু হোয়েল সংস্কৃতি
.............................................................................................
সাবধানে চালাবো গাড়ী, নিরাপদে ফিরবো বাড়ী
.............................................................................................
বন্ধুদেশের ঋণের বোঝা এবং নতুন প্রজন্মের ভাবনা
.............................................................................................
চালে চালবাজী : সংশ্লিষ্টদের চৈতন্যোদয় হোক
.............................................................................................
৫ প্রস্তাবে বাংলাদেশে সংকট : দুর্ভিক্ষ আসন্ন
.............................................................................................
ভুখা মানুষের স্বার্থে সরকারকে কঠোর হতে হবে
.............................................................................................
রোহিঙ্গা তরুণের চিঠি এবং আমাদের করণীয়
.............................................................................................
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল প্রসঙ্গে অনেকের অভিমত
.............................................................................................
তরুন প্রজন্মের সৈনিকেরা জেগে উঠলে কোন অপশক্তিই বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করতে পারবে না
.............................................................................................
আদর্শ সংবাদ ও সাংবাদিকতা
.............................................................................................
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহসী হতে হবে
.............................................................................................
পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
.............................................................................................
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...
.............................................................................................
ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী মাদার বখশ
.............................................................................................
গ্রামীণ মানুষের সম্পদ বাড়ছে না, ঋণ বাড়ছে
.............................................................................................
ইসি গঠনে বিএনপি’র ফর্মূলা সুধিজনের ভাবনায় যুগোপযোগী
.............................................................................................
কর্পোরেট বিশ্বায়ন ও নয়া সমবায় আন্দোলন প্রসঙ্গে
.............................................................................................
ইছামতি নদী উদ্ধার এখন পাবনাবাসীর সময়ের দাবী
.............................................................................................
ঈদের জামাতে শোলাকিয়ার ঈদগাহ ময়দান, বেদনার অশ্রুধারা
.............................................................................................
যানজট নিরসনে সেনাবাহিনিকে দায়িত্ব দিন রোজার আর ঈদকে আনন্দময় করতে সেনা মোতায়েন জরুরী
.............................................................................................
সাঁড়াশি অভিযানের নামে হুটহাট তাড়নী কিচ্চা
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
স্বাধীন বাংলা মো. খয়রুল ইসলাম চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত
প্রধান উপদেষ্টা: ফিরোজ আহমেদ (সাবেক সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
উপদেষ্টা: আজাদ কবির
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: ডাঃ হারুনুর রশীদ
সম্পাদক মন্ডলীর সহ-সভাপতি: মামুনুর রশীদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: খায়রুজ্জামান
যুগ্ম সম্পাদক: জুবায়ের আহমদ
বার্তা সম্পাদক: মুজিবুর রহমান ডালিম
স্পেশাল করাসপনডেন্ট : মো: শরিফুল ইসলাম রানা
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি: জুবের আহমদ
যোগাযোগ করুন: swadhinbangla24@gmail.com
    2015 @ All Right Reserved By swadhinbangla.com

Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]